Friday, December 2, 2016

জেনি ফন ভেস্টফালেন- সমাজ পরিবর্তনের দর্শন প্রতিষ্ঠার প্রধান অংশীদার এবং কার্ল মার্কসের সহধর্মিনী


তারিখঃ ২ ডিসেম্বর, ২০১৬
জেনি ফন ভেস্টফালেন বা জেনি মার্কস। তিনি কার্ল মার্কসের স্ত্রী হিসেবে পরিচিত। কার্ল মার্কসের সহধর্মিনী হিসেবে তিনিও সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবী দর্শনকে তাত্ত্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন। প্রুশিয়ার অভিজাত পরিবারের সন্তান হিসেবে উত্তর জার্মানের সলসভেদেলে শহরে ১৮১৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী তাঁর জন্ম। মৃত্যু হয় ১৮৮১ সালের ২ ডিসেম্বর। ৬৭ বছর পর্যন্ত তিনি বেঁচে ছিলেন। সাত সন্তানের জননী হয়েছিলেন। কার্ল মার্কসকে বিয়ে করার পরে তাঁর নাম হয়ে যায় জেনি মার্কস। তাঁর পুরো নাম জোহানা বার্থা জুলিয়া জেনি ফন ভেস্টফালেন।

১৮১৬ সালের দিকে জেনি মার্কসের পিতা ট্রিয়ার শহরে চলে আসেন। সেখানে কার্ল মার্কসের পিতা ও জেনি ফন ভেস্টফালেনের পিতার মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। কার্ল মার্কস তখন ১৩ বছরের বালক।  সেই বয়সেওি তার চোখেমুখে ছিল বিদগ্ধতার ছাপ।  জেনি মার্কসের বাবা ব্যারন লুডভিগ ফন ভেস্টফালেন তাকে নিয়ে হাঁটতে বেরোতেন। এসময় তিনি কার্ল মার্কসকে দান্তে, হোমার, গ্যেটে, শেকসপীয়ারে লেখা থেকে উদ্ধৃতি শোনাতেন। তাঁরা ইউরোপের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতেন। লুডভিগ ভেস্টফালেন কার্ল মার্কসকে ফ্রেঞ্চ ইউটোপীয়ান সমাজতান্ত্রিক সেইন্ট শিমনের লেখা পড়তে দিতেন। বস্তুত, কার্ল মার্কস যে সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন তার মূলে ছিল জেনির পিতা লুডভিগ ফন ভেস্টফালেনের এই ভূমিকা। এবং কার্ল মার্কস যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পিএইচডি থিসিস লেখেন তখন তিনি থিসিসের মুখবন্ধে ব্যারন লুডভিগ ভেস্টফালেনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। জেনি মার্কসও তার পিতার উত্তরাধিকার বহন করেছেন। তিনিও ছিলেন বিদুষী মহিলা। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর জানাশোনা ও লেখাপড়া ছিল। তিনি একই সাথে ছিলেন আকর্ষনীয়া- ট্রিয়ার শহরে বহু যুবক তরুণের স্বপ্নসাথী। 
তবে হয়তো বা সেই সময়ের পরিস্থিতিতে ইউরোপের মত মুক্ত সমাজব্যবস্থার দেশেও কার্ল মার্কসের মত ভুমিকা জেনি মার্কস নিতে পারেননি। অথবা, কার্ল মার্কসকে  তার আরাধ্য কাজের সুযোগ করে দিয়ে তিনি শ্রমবন্টনের নিয়ম অনুযায়ী প্রধানত গৃহিণীর কাজে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন স্বেচ্ছায়। নতুবা তিনিও হতে পারতেন বিদুষী কোন লেখিকা অথবা নারী দার্শনিক!
 জেনি মার্কসের মত একজন নারীকে কার্ল মার্কস স্ত্রী হিসেবে পেয়েছিলেন বলেই হয়ত কার্ল মার্কস হতে পেরেছিলেন একজন সমাজ পরিবর্তনের পথপ্রদর্শক দার্শনিক ও বিপ্লবী! জেনি মার্কসের মেয়ে এলিনর মার্কস এভেলিং তার মা’কে স্মরণ করে লিখেছিলেন, স্ত্রী জেনী মার্কসের সহায়তা না পেলে কার্ল মার্কস কোন কিছুই করে যেতে পারতেন না।
আর কার্ল মার্কসও জেনি মার্কসকে ছাড়া ছিলেন যেন হালবিহীন বা পালবিহীন নৌকার মতো। ম্যারী গ্যাব্রিয়েল ’লাভ এন্ড ক্যাপিটাল: কার্ল এন্ড জেনী মার্কস এন্ড বার্থ অব এ রেভ্যলুশন’ বইয়ে কার্ল মার্কসের জীবনে জেনি মার্কসের অপরিহার্যতা সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেছিলেন, ’ তিনি(জেনি মার্কস) কার্ল মার্কসের শুধুমাত্র একজন বন্ধু এবং প্রণয়ী বা প্রেমিকাই ছিলেন না। তাদের দু’জনের মধ্যে পরিণয় বন্ধনের ১৩ বছর আগে থেকেই জেনি মার্কস ছিলেন কার্ল মার্কসের বিশস্ত  বৌদ্ধিক আলোচনার সহসাথী। জেনি মার্কসকে ছাড়া কার্ল মার্কসের হৃদয় এবং বুদ্ধিজ্ঞানও কাজ করত না(Neither his heart nor his head functioned without her.) ) ।
জেনি মার্কসের সাথে কার্ল মার্কসের ছোটকাল থেকেই পরিচয় ছিল। জেনি মার্কসের ছোটভাই এডওয়ার্ড ফন ভেস্টফালেনের সাথে কার্ল মার্কসের বন্ধুত্ব ছিল। কার্ল মার্কস জেনী মার্কসের চেয়ে বয়সে ৪ বছরের ছোট ছিলেন। ১৮৪৩ সালের ১৯ জুন তারা দু’জন ট্রিয়ারের কাছে ক্রোয়েটসনাখ শহরে খ্রিস্টান বিবাহ রীতি অনুযায়ী বিয়ে করেন। এর আগে ১৮৩৬ সালের দিকে তারা গোপনে বাগদান সম্পন্ন করেন। ১৮৪৩ সালে যখন তাদের বিয়ে হয় তখন জেনি মার্কসের বয়স ছিল ২৯ বছর আর কার্ল মার্কসের বয়স ছিল ২৫ বছর। 
বিয়ের পরে তারা প্যারিসে চলে যান। সেখানে ১৮৪৪ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে তাদের প্রথম সন্তান জেনিচেন বা জেনী জন্ম নেন। পরে প্যারিস থেকে জেনি ট্রিয়ারে তার মায়ের কাছে চলে যান। সেখান থেকে তিনি কার্ল মার্কসকে কয়েকটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে দেখা যায় তিনি তাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করছেন। ১৮৪৪ সালের ২১ জুন কার্ল মার্কসকে তিনি লেখেন- 
প্রিয়তম আমার, প্রায়ই আমি গভীরভাবে আমাদের কাছের এবং দূরের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি। এবং এখন যেভাবে নিশ্চিন্ত হাসিখুশী জীবন কাটাচ্ছি তার জন্য আমাকে মূল্য দিতে হবে নিশ্চয়ই। সম্ভব হলে আমাকে এ বিষয়ে পরামর্শ দিও যেন আমি এভাবে চিন্তিত না হই। সবাই একটা নিশ্চিত আয়ের পথ খুঁজে নিতে বলে।  এসকল পরামর্শ শোনার পরে আমি একগাল হাসি দিয়ে বা গালে হাত দিয়ে বা পরনের কাপড় নেড়েচেড়ে বা মাথার টুপি নিয়ে খেলা করে বা চুল নাড়তে চাড়তে সাধারণ উত্তর দিয়ে যাই। কিন্তু এরপরে আমার বুকে যে ছটফটানি ধরে এবং ভবিষ্যত চিন্তা আমাকে যেভাবে উদ্বিগ্ন করে তা দেখার তো আর কেউ থাকে না। 
(Dearest heart, I am often greatly worried about our future, both that near at hand and later on, and I think I am going to be punished for my exuberance and cockiness here. If you can, do set my mind at rest about this. There is too much talk on all sides about a steady income. I reply then merely by means of my rosy cheeks, my clear skin, my velvet cloak, feather hat and smart coiffure. That has the best and deepest effect, and if as a result I become depressed, nobody sees it.)
তবে এরপরই তিনি একই চিঠিতে কার্ল মার্কসকে লেখালেখি বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করেন। তিনি লেখেন-
 শুধুমাত্র বিদ্বেষাত্মক ও খিটখিটে টাইপে লেখালেখি করো না। তুমি জানো, তোমার লেখা কতটা পরিমাণে প্রভাবিত হয়ে থাকে। বস্ত যা তা-ই লিখো এবং গভীরে গিয়ে লিখো অথবা সরস হাল্কাচালে লেখার চেষ্টা করো।
 (Only don't write with too much rancour and irritation. You know how much more effect your other articles have had. Write either in a matter-of-fact and subtle way or humorously and lightly.)
 ১৮৪৪ সালের আগস্ট মাসে এঙ্গেলসের সাথে কার্ল মার্কসের দেখা হয় এবং তারা বুদ্ধিবৃত্তিক দার্শনিক আলোচনা চালিয়ে যান। পরে তাদের এই বুদ্ধিবৃত্তিক বৌদ্ধিক বন্ধুত্ব ইতিহাসে অমর হয়ে যায়। এঙ্গেলসের সাথে আলাপ হবার পরে তারা দুইজনে মিলে জার্মানীর সাইলেসীয় তাঁতীদের সংগ্রামে ভুমিকা রাখেন। জার্মানীর সরকার এতে ক্ষুব্ধ হয় এবং কার্ল মার্কসকে প্যারিস থেকে বহিস্কার করতে ফ্রান্স সরকারকে অনুরোধ জানায়।  ১৮৪৫ সালের প্রথম দিকে কার্ল মার্কসকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে প্যারিস ছাড়তে বলে ফ্রান্স পুলিশ।
ফ্রান্স সরকার জেনী মার্কসকে আরো কিছুদিন থাকতে অনুমতি দেয়। পরে জেনি মার্কস ঘরের আসবাবপত্র সম্পত্তি সরঞ্জাম বিক্রি করে ব্রাসেলসে যাওয়ার টাকা সংগ্রহ করেন এবং ব্রাসেলসে কার্ল মার্কসের কাছে চলে যান। ব্রাসেলসে তারা চরম অর্থকষ্টে পড়েন। ১৮৪৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের দ্বিতীয় সন্তান লরা মার্কসের জন্ম হয়। 
১৮৪৬ সালে ব্রাসেলসে কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলস কম্যুনিস্ট যোগাযোগ কমিটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইউটোপীয় সমাজতন্ত্রীদের ভ্রান্ত দর্শনের বিরুদ্ধে লেখালেখি চালিয়ে যান। এসময় জেনী মার্কস কার্ল মার্কসের লেখালেখিতে সহায়তা করেন। তিনি কার্ল মার্কসের হিজিবিজি লেখাগুলো সুন্দর হস্তাক্ষরে লিখে দিতেন। এছাড়া অন্য কাজেও তিনি মার্কসকে সহায়তা করতেন। 
পোল লাফার্গ তাঁর কার্ল মার্কস স্মরণে প্রবন্ধে সম্পর্কে লিখেছেন- কার্ল মার্কসের ”স্ত্রীর বুদ্ধিমত্তা ও ভালমন্দের বিচারবোধ সম্পর্কে এতখানি শ্রদ্ধা ছিল মার্কসের যে সকল পান্ডুলিপিই তিনি স্ত্রীকে দেখাতেন এবং তাঁর মতামতকে অপরিসীম মূল্য দিতেন। ১৮৬৬ সালে একথা তিনি নিজেই আমাকে বলেছিলেন। ছাপাখানায় পাঠানোর আগে স্বামীর পান্ডুলিপিগুলি শ্রীমতি মার্কস নিজের হাতে কপি করে দিতেন।
মদনমোহন গুহ তাঁর ’কার্ল মার্কসের জীবনে জেনি’ বইয়ে লেখেন- তাঁর(জেনি মার্কস) সময় কেটে যেতো মার্কসের লেখা প্রবন্ধগুলি কপি করতে করতে। তাতে তিনি আনন্দ পেতেন। পেতেন সান্ত¡না। তদুপরি প্রবন্ধগুলি কপি করতে গিয়ে সেগুলি তাঁর পড়া হয়ে যেতো। বেশ ভালভাবেই এরফলে বিশ্বের তদানীন্তন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল হবার সুযোগ পেতেন।(পৃ: ৫৯)
১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারীতে তাদের তৃতীয় সন্তান এডগারের জন্ম হয়। তাদের এই সন্তান ১৯৫৫ সােেল ৮ বছর বয়সে মারা যান। 
১৯৪৮ সালের মার্চ মাসের ৩ তারিখ প্রুশিয়া সরকারের অনুরোধে বেলজিয়াম সম্রাটের স্বাক্ষরে  কার্ল মার্কসকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ব্রাসেলস ছেড়ে যেতে বলা হয়। ব্রাসেলসের পুলিশ তাকে আটক করে পুলিশ হাজতে রেখে দেয়। জেনি মার্কস  থানায় তার খোঁজ নিতে গেলে পুলিশ তাকেও থানায় আটকে রাখে। পরদিন তাদের মুক্তি দেয়া হলেও তাদেরকে ৫ মার্চের মধ্যে ব্রাসেলস ছেড়ে প্যারিসে চলে যেতে হয়। যাবার সময় তারা কোন কিছুই নিয়ে যেতে পারেননি। জেনি মার্কস তাঁর এক স্মৃতিকথায় এ বিষয়ে লিখেন- চলে আসার সময় দিনটা ছিল ঠান্ডা, মেঘে-ঢাকা, বিরস আর বাচ্চাদের শরীর গরম রাখা শক্ত হয়ে পড়েছিল। এদিকে আমার কোলের বাচ্চার বয়স তখন মাত্র এক বছর। 
 প্যারিসে কিছুদিন থাকার পরে সেখানেও পুলিশ এসে তাদের প্যারিস ছাড়তে বলল। এরপর তারা চলে যান জাার্মানে। 
১৯৪৮(৪৯?) সালের মে মাসের দিকে জেনী ৪র্থ বারের মত অন্তঃস্বত্বা হন। বিপ্লবী কাজের জন্য জার্মান থেকে  কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলসকে বিতাড়িত হতে হলো। এবার আরকেবার কপর্দকশুন্য অবস্থায় জেনী মার্কসকে ঘর ছাড়তে হলো। তাকে গর্ভবতী সন্তানসহ আরো তিন সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নিতে হলো ট্রিয়ারে তার মায়ের কাছে। চতুর্থ সন্তান হেনরী এডওয়ার্ড গুইডো ১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বরে জন্মগ্রহণ করেন। তবে একবছর না হতেই তাদের এই সন্তান মারা যায়। 
১৮৪৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জেনি মার্কস ও কার্ল মার্কস লন্ডনে আসেন। কয়েকদিন হোটেলসহ বিভিন্ন স্থানে থাকার পরে তারা সোহো নামক এলোকার ৬৪ নং ডিন স্ট্রীটের একটি বাড়িতে উঠেন। এসময় তাদের পরিবারে চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কাল চলতে থাকে। 
১৮৫০ সালের ২০ মে জেনি মার্কস ফ্রাঙ্কফুর্টের জনৈক ভাইডেমারের কাছে একটি মর্মস্পর্শী চিঠি লিখেন। এই চিঠিতে বোঝা যায় তারা কী নিদারুণ অর্থকষ্টে জীবন অতিবাহিত করেছেন। কিন্তু তারপরেও জেনী মার্কস বিপ্লবকে বিসর্জন দেয়ার কথা চিন্তা করেননি। ভাইডেমায়ারের কাছে তিনি লেখেন- ’ ... কার্লের প্রাপ্য কিছু পারিশ্রমিক পেয়ে থাকলে কিংবা ভবিষ্যতে পেলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা যেন আমাদের পাঠিয়ে দেন। টাকাটা আমাদের ভীষণ, ভী-ষ-ণ দরকার।’
আর্থিক অভাব অনটনের কথা লেখার পরে তিনি লেখেন- মনে করবেন না এইসব তুচ্ছ ছোটখাটো দুঃখ দুর্দশা, ভাবনা চিন্তা আমার মনোবল নষ্ট করে দিয়েছে। আমি খুব ভালো করেই জানি যে আমাদের সংগ্রাম বিচ্ছিন্ন কোন ব্যাপার নয়। ...। সত্যি সত্যি যা আমার আত্মাকে কষ্ট দিচ্ছে এবং হৃদয়কে রক্তাক্ত করছে, তা হলো এই চিন্তা যে, ছোট খাটো ব্যাপারের জন্য আমার স্বামীকে কতোই না কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে, আমার পক্ষে কত সামান্য পরিমাণেই না তার সাহায্যে আসা সম্ভব হচ্ছে, এবং যিনি স্বেচ্ছায় ও সানন্দে অসংখ্য লোকের উপকার করে এসেছেন, তিনি নিজে কত না অসহায়! কিন্তু তাই বলে, প্রিয় হের ভাইডেমার, ভুলেও এ কথা ভাববেন না যে, আমরা কারো কৃপাপ্রার্থী। (সূত্রঃ কার্ল মার্কস মানুষটি কেমন ছিলেন, জাকির তালুকদার, পৃ:১০৩, ঐতিহ্য, ফেব্রুয়ারি, ২০১৫)
এ সময় তাদের সংসারের টানাটানি থাকলেও তাদের বাড়িতে যখন কেউ আসতেন তাদেরকে জেনি নিজের সাধ্যমত আপ্যায়ন করার চেষ্টা করতেন। পোল লাফার্গ তার কার্ল মার্কস স্মরণে প্রবন্ধে লিখেছেন- সকল দেশের বহু শ্রমিকই শ্রীমতি মার্কসের আতিথেয়তায় ধন্য হয়েছেন। 
সংসারের টানাটানি সামাল দিতে তিনি হল্যান্ডে মার্কসের মামা লিওন ফিলিপসের কাছে সহায়তা চান। কিন্তু ফিলিপস সহায়তা দেননি। এসময় তিনি খুব ভেঙে পড়েন। 
তাদের পঞ্চম সন্তানের নাম জেনি ইভালিন ফ্রান্সিস। ১৮৫১ সালের ২৮ মার্চ তার জন্ম হয়। ১৮৫২ সালের ১৪ এপ্রিল এক বছরের কিছু বেশি সময় বেঁচে থেকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।  
১৮৫৫ সালের ১৬ জানুয়ারি ৬ষ্ঠ সন্তান জেনি জুলিয়া এলিযেনর জন্মগ্রহণ করেন। ৭ম সন্তানটি ১৮৫৭ সালের ৬ জুলাই জন্মগ্রহণ করে এবং মারা যায়। সেই সময়গুলোতে  অনেক সময় তারা তাদের পরিবারের জন্য দু’বেলা দু’মুঠো ভাত জোগাড় করতে পারতেন না। পরে তার এক বান্ধবী লীনা শ্যোলা তার বাড়িতে আসেন। জেনির দুরবস্থা দেখে তিনি ব্যথিত হন এবং জেনিকে কিছু সহায়তা করেন। পরে ১৯৬০ সালে তারা আবার অর্থকষ্টে পড়েন। কার্ল মার্কস আমেরিকার ট্রিব্রিউন পত্রিকায় লেখালেখি করে যে আয় করতেন তা কমে যায়। ঠিক সেই সময়ে জেনি মার্কস বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। রোগের কারণে তার দুই চোখ নষ্ট হতে বসেছিল। 
অপরদিকে তার মেয়েদেরও বয়স বাড়ছিল। বয়সের সাথে সাথে তাদের নানা আনুষঙ্গিক খরচও বেড়ে যাচ্ছিল। অথচ সে অনুযায়ী আয় উপার্জন ছিল না। তবে ১৯৬৪ সালের দিকে কার্ল মার্কসের মামা/কাকা মারা গেলে তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে কিছু সম্পত্তি ও অর্থ পান। এ সময় তারা কিছুটা অনটন থেকে রক্ষা পান। একইসাথে এঙ্গেলসও ১৯৫০ থেকে তাদের পরিবারকে মাঝে মাঝে আর্থিক সহায়তা দিতেন। এভাবেই তাদের সংসার জীবন কেটে যাচ্ছিল। জেনি মার্কস বিচক্ষণতার সাথে এই সমস্যা মোকাবেলা করে আসছিলেন এবং কার্ল মার্কসের লেখালেখি ও রাজনৈতিক কাজ যেন থেমে না থাকে সেই চেষ্টা তিনি করে যাচ্ছিলেন। 
জেনি মার্কসের চার সন্তান খুব কম বয়সে মারা যায়। বাকি তিন কন্যা সন্তান যারা বেঁচে ছিলেন তারাও নানাভাবে সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। 
১৮৮১ সালের ২ ডিসেম্বর জেনী মার্কসের মৃত্যু হয়। ৫ ডিসেম্বর হাইগেট সমাধিক্ষেত্রে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। সমাধিক্ষেত্রে আইভি লতায় ঢাকা মার্বেল পাথরের উপর খোদাই করে জেনি ফন ভেস্টফালেনের নামের সাথে লেখা রয়েছে- কার্ল মার্কসের প্রিয়তমা পত্নী|(The Beloved Wife of Karl Marx).
 সমাধিক্ষেত্রে অন্ত্যেস্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে এঙ্গেলস জেনী মার্কস সম্পর্কে বলেছিলেন, ”এই মহিলা, তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা একইসাথে রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, চরিত্রের মধ্যে ছিল উদ্যম এবং আবেগ, এবং সংগ্রামের ক্ষেত্রে তার সহযোদ্ধাদের প্রতি তাঁর অপরিসীম উৎসর্গীকৃত মানসিকতার মাধ্যমে গত ৪০ বছরে যে অবদান রেখে গেছেন তা কোনকালেই জনগণের কাছে প্রকাশ পায়নি এবং সমসাময়িক কোন সংবাদ মাধ্যমে এই কীর্তি ঘোষিত হয়নি। এটা এমন যা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমরা অনুভব করেছি। 
কিন্তু এই একটি বিষয়ে আমি নিশ্চিত যে, রিফিউজি কমিউনের স্ত্রীরা তাকে প্রায়ই স্মরণ করবে, আর বাকি আমরাা তার সাহসী ও প্রাজ্ঞ পরামর্শ অবশ্যই মিস করবো....। 
আমি এখানে তার গুণাবলীর কথা বলতে চাই, যা তার বন্ধুরা জানে এবং স্মরণে রাখবে, তা হল, অপরকে সুখী করে যিনি নিজে সুখী বোধ করেন, তিনি হলেন তাই।” 
(The contribution made by this woman, with such a sharp critical intelligence, with such political tact, a character of such energy and passion, with such dedication to her comrades in the struggle — her contribution to the movement over almost forty years has not become public knowledge; it is not inscribed in the annals of the contemporary press. It is something one must have experienced at first hand.

But of one thing I am sure: just as the wives of the Commune refugees will often remember her — so to, with the rest of us have occasion enough to miss her bold and wise advice, bold without ostentation, wise without ever compromising her honor to even the smallest degree. I need not speak of her personal qualities, her friends know them and will not forget them. If there ever was a woman whose greatest happiness was to make others happy it was this woman.)
তথ্যসূত্রঃ
৮. কার্ল মার্কস মানুষটি কেমন ছিলেন, জাকির তালুকদার, পৃ:১০৩, ঐতিহ্য, ফেব্রুয়ারি, ২০১৫।
৯. কীর্তিময় এক বন্ধুত্ব, শেখর দত্ত, বিপ্লবীদের কথা প্রকাশনা, নভেম্বর, ২০১৪।
১০. মার্কস এঙ্গেলস স্মৃতি, বোধি, বাংলাদেশ সংস্করণ, অমর একুশে গ্রন্থমেলা, ২০১১।
১১. কার্ল মার্কসের জীবনে জেনি, মদনমোহন গুহ, মিরান্দা পাবলিশার্স, পশ্চিমবঙ্গ বইমেলা, ২০০১।

No comments:

Post a Comment