Friday, September 26, 2014

ডিয়ার পার্বত্যমন্ত্রী শিক্ষার জন্য ভিক্ষা করার দরকার নেই

লেখাটি লেখার সময় হেডিঙ কী দেবো তা নিয়ে চিন্তা করলাম কিছুক্ষণ। প্রথমে চিন্তা করলাম হেডিঙ দেবো এভাবে- মন্ত্রীবর, ভিক্ষা ’মাগার’ দরকার নেই, ‘কুকুর’ সামলান! কিন্তু তা যুৎসই মনে করলাম না। তারপর ভাবলাম, হেডিঙ দেবো এভাবে, ডিয়ার পার্বত্যমন্ত্রী, মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ দেখাবার দরকার নেই। কিন্তু ভাবলাম, এত সরাসরি ’হিট’ করার মতো হেডিঙ বা  শিরোনামা না দিয়ে একটু মাইল্ড হেডিঙ দিই। তাই উপরের হেডিঙ দিলাম।
প্রসঙ্গে চলে আসি। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী বীর বাহাদুর ঊশেচিঙ এমপি আজ ২৬ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি এসেছেন(আদতে তিনি হলেন প্রতিমন্ত্রী, কিন্তু আমি ভাবলাম সরকার যদিওবা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তাকে মন্ত্রী পদমর্যাদা না দিন, অন্তত আমার লেখায় তাকে ’মন্ত্রী’ সম্বোধন করে দুধের  ঘোলে মেটাবার চেষ্টা করি। তাই তাকে মন্ত্রীই বললাম!)। তিনি খাগড়াছড়ি টাউন হলে আয়োজিত ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। সেখানে তিনি অনেক কথার মধ্যে খুবই ’প্রশংসনীয়’ ‘উজ্জীবিত করার  মতো’ ‘হাততালি পাওয়ার মতো’ কিছু কথা বলেছেন। এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমরা এসব খবর খুবই সত্বর জানতে সমর্থ হলাম।
তিনি সেই সভায় বলেছেন,
পিছিয়ে পড়া পার্বত্যাঞ্চলকে এগিয়ে নিতে শিক্ষার কোন বিকল্প নাই। যদি সরকারী অর্থ সহযোগিতা পাওয়া না যায় প্রয়োজনে শিক্ষার জন্য ভিক্ষা মাগবো (করবেন), তবুও পার্বত্যাবাসীকে শিক্ষার দিক থেকে এগিয়ে নেব। (তথ্যসূত্র: সিটিজিটাইমস ওয়েবসাইট)
খুবই প্রশংসনীয় কথা! হাততালি পাবার মতো কথা! অর্থাৎ তিনি যে আন্তরিক শিক্ষানুরাগী একজন ব্যক্তি তা তার কথামতো বোঝা যায়। এবং তিনি যে আদতেই শিক্ষার প্রতি ভালবাসা বা অনুরাগ প্রদর্শন করেন, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকবে না তা সংগতভাবে বিবেচিত হবে বলেই বোধ হয়। কারণ তিনি নিজেই একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি। সুতরাং তিনি জানেন, শিক্ষার মূল্য অনেক অনেক বেশি।
কিন্তু তার এই শিক্ষার প্রতি ব্যক্তিগত ‘ভালবাসা’ বা ’অনুরাগ’-এর প্রতি সম্মান রেখেও আমাকে কিছু কথা বলতে হচ্ছে। এবং তা না বলে থাকা সংগত হবে না বা সচেতনতাবোধের প্রকাশ পাবে না বলেই মনে হলো। তাই এই লেখার অবতাড়না।
তিনি সরকারের কাছ থেকে অর্থ সাহায্য পাবেন অথবা পাবেন না তা নিয়ে কথা বলবো না। আমি বলতে চাই, তিনি যা বলেছেন তা যদি আদতেই বিশ্বাস করেন বা করতে চান তবে বোধকরি তিনি এতসব বাগাড়ম্বর বাদ দিতে পারেন। পার্বত্যাঞ্চলে শিক্ষার দিক থেকে পিছিয়ে থাকার যে কারণসমূহ তা তিনি চিহ্নিত করতে পারেন। এবং তিনি যদি সেই কারণসমূহের খোজ নেন তবে তিনি দেখবেন, তার গড়া সরকার বা এই শাসকদের গড়া সরকারই পার্বত্যাঞ্চলে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের আসল হোতা বা মূল অপরাধী
সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম স্থানীয় সরকার পরিষদ(বর্তমানে তা পার্বত্য জেলা পরিষদ নামে পরিচিতি) গঠন করেছে। এবং অনির্বাচিত তল্পিবাহক কিছু ব্যক্তিকে সেখানে বসিয়ে রেখে তিন পার্বত্য জেলার এই প্রশাসনিক পরিষদের কাজ চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কথা ছিলো এই পরিষদসমূহের ‍নির্বাচন তারা দেবে। কিন্তু, তা কথার কথা মাত্র! দশক-যুগ পেরিয়ে নতুন দশক ও যুগ শেষ হবার পথে কিন্তু এই পরিষদকে ‘জনপ্রতিনিধিত্বশীল’ করার দিকে সরকারের রা নেই, চেষ্টা তদবির পর্যন্ত নেই!
কথা হলো, সরকার তার প্রশাসনিক রাজনৈতিক ক্ষমতাসম্পন্ন বিভাগসমূহ ভাজা করে বা রান্না করে বা কী যা তা করবে তা নিয়ে মাথা ব্যথা করার কী ই বা প্রয়োজন!
কিন্তু, এতেই বিবাদ যত বিপত্তি!
এই জেলা পরিষদের পদসমূহে তিন পার্বত্য জেলায় সরকার যে সকল অনির্বাচিতদের তাদের তল্পিবাহক হিসেবে বসিয়ে রাখে তারা যে কী চীজ, তারা যে পার্বত্যাঞ্চলের কী ক্ষতি তস্য ক্ষতি তস্যতর জঘন্যতম ক্ষতি করে যাচ্ছে সেদিকে খেয়াল করলে, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করলে দিন ও রাতে ঘুম হারাম হতে বাকী থাকার কথা না অন্তত যারা সচেতন তাদের জন্য এটাই সত্য!
এতসব তস্যতর জঘন্য কী ক্ষতি এই পরিষদের সরকারী মনোনীতরা করে যাচ্ছে আমি সেদিকে যাবো না। আজ শুধু বলবো, এই পরিষদের দ্বারা পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষার কী ক্ষতি হচ্ছে তা নিয়ে। এখানে বলে রাখি, আমার কাছে কোনো ডাটা বা তথ্য বা পরিসংখ্যান কিন্তু নেই।
আমার কাছে আছে ইতিহাসের সাবঅল্টার্ন নামীয় সেই সুবিশাল তথ্য! শত ডজন মানুষের অভিজ্ঞতা যা অলিখিত!
জেলা পরিষদ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারে। আর এই শিক্ষক নিয়োগের সুবাদে জেলা পরিষদের অনির্বাচিত সদস্যরা একজন শিক্ষক নিয়োগ প্রদানের মাথাপিছু ‘উপরি’ ’পাওনা’ ’ঘুষ’ ধার্য করে ৩ বা ৪ বা ৫ বা ৬ বা ৭ লাখ বা তারও বেশি পরিমাণ টাকা।
শিক্ষক হতে তাই ‘মেধার’ দরকার নেই। দরকার টাকা। দরকার সুবিধামত একটি লাইনের বা লিংকের! এভাবে একজন ক্লাশ ফাইভ পাশ করা ব্যক্তি(নারী বা পুরুষ) বা যে ব্যক্তির নিজের লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগই নেই সেই পেয়ে যায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদের লোভনীয় চাকুরি।
অতপর, এই সকল শিক্ষক নামীয় ব্যক্তিরা চাকুরি পেয়ে যায় অর্থের জোরে, লাইন বা লিংকের জোরে।
তারপর তাদের কাছ থেকে শিক্ষা প্রদান বা শিক্ষা দান বা ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়া শিখিয়ে দেয়া আশা করা যায় তবে পাওয়া যায় যে অতি নগন্য তা ই যেন দুর্বৈব সত্য!
এবং এতে শত শত অ-শিক্ষক নামীয় শিক্ষকদের নিয়েই আজ পার্বত্যাঞ্চলের প্রাইমারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ ভর্তি হয়ে আছে! তবে ব্যতিক্রমও যে নেই তা তো নয়! কিন্তু ব্যতিক্রম ব্যতিক্রমই।
আর এই কারনেই আজ পার্বত্যাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার ‘বারোটা’ বেজে যেতে বসেছে।
আজ সেদিকে খেয়াল করলে মাথা ব্যথা করে, চুল ছিড়তে ইচ্ছে করে।
অথচ, সেই সরকারেরই একজন মন্ত্রীবর শিক্ষানুরাগী ‘গরু মেরে জুতা দান’ করে বক্তব্য দেন! তিনি বলেন, বৃত্তির টাকা ২০ লাখ থেকে  ৫ লাখ বাড়িয়ে ২৫ লাখ করেন। এতেই তিনি বাহবা পান!
আজকাল কী যে দিনকাল পড়েছে! গরু মারার পরে জুতা দান করলেই বোধহয় আজ সবাই বাহবা প্রদান করে থাকেন!

Saturday, September 20, 2014

শহীদ রূপক চাকমাকে স্মরণ করছি, তাকে জানাই সশ্রদ্ধ লাল সালাম!

এক বছর আগের লেখা শেয়ার করলাম।

(এক)

[ শহীদ রূপক চাকমা। আমার কাছে এক আবেগের নাম, সম্মানের সাথে স্মরণ করার জন্য একটি নাম। ছোটোকালে তাকে দেখেছি। কিছুদিন আমাদের পরিবার নারাঙহিয়া অনন্ত মাস্টার পাড়ায় থাকার সময় তাঁর সাথে পরিচয়। একসাথে  'নাধেঙ(লাঠিম)' খেলেছি। তিনি আমাদের সিনিয়র। পরে সেখান থেকে চলে গেলে তাঁকে অনেকদিন দেখিনি। তারপর ভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর তাঁর সাথে দেখা। তখন তো তিনি সংগঠনের একনিষ্ঠ কর্মী এবং নেতা। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি হয়েছিলেন। যখন বক্তব্য রাখতেন তখন আত্মবিশ্বাস নিয়ে বক্তব্য রাখতেন। যুক্তি তুলে ধরতেন ধারালোভাবে।
২০০১ সালের ২০ মে। পিসিপির ১ যুগপূর্তি অনুষ্ঠান ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। থিম শ্লোগান ছিলো-
আদর্শের পতাকা সমুন্নত রেখে পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের লড়াইয়ে সামিল হোন- সমস্ত রকমের লাম্পট্য, নষ্টামি ও সুবিধাবাদীতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।
র‌্যালি বা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে। আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঢাবি টিএসসি সেমিনার রুমে।
আলোচক হিসেবে কয়েকজনের মধ্যে ছিলেন বাংলাদশের সমাজতান্ত্রিক দল(বাসদ)-এর নেতা খালেকুজ্জামান। তিনি এই থিম শ্লোগানের সমালোচনা করে সভায় বলেছিলেন যে, এই শ্লোগান রাজনৈতিক শ্লোগান নয়। 'লাম্পট্য নষ্টামি' শব্দগুলো রাজনৈতিক শব্দ বা পরিভাষা নয় বলে তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন।
সকল আলোচক বক্তব্য দেবার শেষে সভাপতি হিসেবে রূপক চাকমা উঠে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিলেন। তিনি এই থিম শ্লোগানের পক্ষে তাঁর যুক্তি খুবই গুছিয়ে তুলে ধরলেন। আমি মন্ত্রমুগ্ধের(!) মতো শুনলাম। এবং উপস্থিত শ্রোতা যারা সেদিন বক্তব্য শুনেছিলেন তারা এই যুক্তিকে মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু আজ এত বছর পরে ঐ যে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলাম! এখন তার কিছুই আমার মনে নেই! কিন্তু যেদিন এই জোরালে যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য শুনেছিলাম সেদিন  বুক সোজা সটান করে গৌরব করেছিলাম, হ্যাঁ, আমাদের সংগঠনের শ্লোগান ঠিক আছে। হ্যাঁ, আমাদের প্রাণপ্রিয় সংগঠনের থিম শ্লোগান রাজনৈতিক দিক থেকে অবশ্যই অবশ্যই বেঠিক নয়।
এই হলেন রূপক চাকমা। আমার বা আমাদের রূপক চাকমা! এখন তিনি শহীদ রূপক চাকমা।
তাকে নিয়ে লেখা এ খন্ড খন্ড বক্তব্য আজ তুলে ধরছি পাঠকদের কাছে। ]

(দুই)

রূপক চাকমা শহীদ দিবস ২১ সেপ্টেম্বর

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

শহীদ রূপক চাকমা! ২০০১ সালে তুমি শহীদ হয়েছিলে। ২১ সেপ্টেম্বর পেরোলেই তোমার মৃত্যুর ১২ বছর পূর্ন হবে। তোমাকে এই দিনে তাই স্মরণ করছি। বড়ই কষ্টের কথা, তুমি হয়তো জানবে যে তোমার বড় ভাইও কয়েকমাস আগে চলে গেছেন। তিনি ক্যান্সারে ভুগছিলেন।
তোমার বাবা এবং মা,যাদের আমি নারাঙহিয়া পাহাড়টি ওঠার সময় বা নামার সময় সবসময় দেখি, তারা কেমন আছে হয়তো তা তুমি জানো অথবা জানো না। তাদের আমি দেখি, তাদের দেখে থাকি। তারা নিঃশব্দ-নিশ্চুপ হয়েয়ে গেছেন। তারা এখন তাদের জীবন নীতি মাত্র পালন করছেন।
শহীদ রূপক! তুমি জীবন দিয়েছিলে! তুমি হয়তো ঝরে পড়েছিলে অসময়ে এবং বড্ডো অসময়ে!
তোমাকে নিয়ে এক স্মরণ সভায় আমি নেপালের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সেই বিপ্লবী উক্তি মুখে নিয়ে বলেছিলাম, মৃত্যুই বা শাহাদাৎ বরণই এক ধরণের বিপ্লবী প্রক্রিয়া! আর এই কথা বলার পরে অনেকেই, যারা সেই আলোচনা সভায় ছিলো তারা অবাক ভরা মুখ ও চোখ নিয়ে আমাকে তাকিয়ে ছিলো! আমি বুঝেছিলাম, কিন্তু কিছুই বলিনি!
সংগ্রাম বা বিপ্লব বা লড়াইকে যতই আমি বুঝতে চেযেছি, যতই তার পাঠ নিয়েছি গভীর থেকে গভীরে ততই এই ধারণাটিই শক্ত হয়েছে যে মৃত্যুও এক ধরণের বিপ্লবী প্রক্রিয়া! এ্ই কথাটি যতই তেতো হোক না কেন, তা-ই সত্য!
কিন্তু যেখানে বিপ্লব নেই! যেখানে বিপ্লব হচ্ছে না তার বেলায় তা কি সত্য!? না, না, নিশ্চয়ই নয়!!
শহীদ রূপক! তুমি চেতনায় থেকো! তুমি বিপ্লবের ময়দানে থেকো!
তোমাকে আরেকবার জানাই লাল সালাম! লাল সালাম ! রেড স্যালুট!

(তিন)

শহীদ রূপক চাকমা লড়াকু চেতনার সৌম্য প্রতীক


২১ সেপ্টেম্বর, ২০১২

শহীদ রূপক চাকমা। পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে শত শহীদের মাঝে একটি নাম, একটি চেতনা। ১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল তিনি জন্মগ্রহণ করেন।  সেনাশাসন-নিপীড়নের আবহ এবং প্রতিনিয়ত ভয়ভীতি-আতংকের আবহে যার শৈশব-কৈশোর কেটেছিলো।

স্কুলে পড়ার সময় সংগ্রামের সাথে নিজেকে জড়িয়ে নেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ছাত্র সমাজের লড়াকু সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে তিনি কাজ করেন ।সংগঠনের সহযোদ্ধাদের কাছে তিনি ঠান্ডমেজাজের শান্ত প্রকৃতির তীক্ষধী সম্পন্ন একজন কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সবাই তাঁর এই সৌম্যভাবকে ভালবাসতেন। তাঁর অনুজ সহযোদ্ধাদের কাছে তিনি শিক্ষনীয়-অনুসরনীয় এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পেরেছিলেন।

তিনি খাগড়াছড়ি সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছিলেন। ১৯৮৯ সালে এসএসসি পাশ করেন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি পাঠ সম্পন্ন করেন। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স মাস্টার্সের পাঠ নেন।।  শেষ করেন ১৯৯৭ সালে। ২০০০ সালে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে ছাত্র সংগঠনের দায়িত্ব ছাড়ার পর তিনি ইউপিডিএফ এ যোগদান করে সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

লেখাপড়ার পাঠ শেষ করে নিজের ব্যক্তিগত উন্নতি-আত্মপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে তিনি  মশগুল হননি।  বেছে নিয়েছিলেন জাতি-জনগণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে বন্ধুর লড়াই সংগ্রামে শরীক হবার পথ। বন্ধুর এই আঁকাবাঁকা পথে কেউ আছাড় খেয়ে পরে যায়। কেউ হারিয়ে যায় অকালে। কেউ সামনে এগুতে এগুতে হাজার হাজার জনকে  পথের নিশানা দেখিয়ে দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে সংগ্রামরে এক দিশারী হিসেবে।

লড়াই সংগ্রামের একটি বাঁকে শহীদ রূপক চাকমাও তাঁর জীবন উৎসর্গ করে দেখিয়ে দিয়েছেন লড়াইএর পথ খুবই পিচ্ছিল-ঝরঝঞ্ঝাপূর্ণ-বিপদসংকুল।

তিনি ২০০১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর নিহত হন। জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর মধ্যে চলমান ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের মাঝে হারিয়ে যাওয়া শতজনের মাঝে তিনিও একজন; কিন্তু  তিনি নিজের গুণাবলী দ্বারা এক অনন্য অনুসরনীয় শহীদ।

আজ ২০১২ সালের এই দিনে তাঁকে আমার সশ্রদ্ধ লাল সালাম।

তোমার পথ বেয়ে আজ আমরাও চলছি বন্ধুর পথ পেরিয়ে। জানি না সামনে আমাদের জন্য কী আঁকাবাঁকা ভবিষ্যত আছে। কিন্তু আমরা জানি সামনে নির্ভীক চিত্তে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই আমাদের লড়াইএ বিজয় অর্জনের প্রথম শর্ত ।

শোক হোক চেতনা শানিত করার এক হাতিয়ার।

শোক হোক অধিকার অর্জনেরর দৃপ্ত ঘোষণা তূর্য নিনাদ।

শোক হোক ঐক্যের ভিত।

যুগ যুগ জিও শহীদ রূপক, যুগ যুগ জিও শহীদ চেতনা।

Friday, September 19, 2014

স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট আমাদের কী পথ দেখাতে পারে

স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতাকামী নেতা পদত্যাগের ঘোষনা দিয়েছেন। স্কটল্যান্ড সংক্রান্ত রেফারেন্ডমের ফলাফল প্রকাশের পর স্বাধীনতার পক্ষের স্কটল্যান্ড ন্যাশনাল পার্টির নেতা আলেক্স স্যামন্ড পরাজয় মেনে নিয়েছেন। তিনি স্কটল্যান্ডের সকল নাগরিকদের এই ফলাফল মেনে নিতে বলেছেন।
১৮ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। স্কটল্যান্ডের মোট ৪২ লাখ ৮৫ হাজার ভোটারের প্রায় অনেকেই ভোট দেন। ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে ফলাফল প্রকাশ হতে থাকে। মোট ৩২টি কাউন্সিলের মধ্যে ৩১টি কাউন্সিলের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায় না ভোট পড়েছে ১৯ লাখ ১৪ হাজার আর হ্যা ভোট পড়েছে ১৫ লাখ ৩৯ হাজার ৯২০টি।  শতাংশ হিসাব করে দেখা যায় মোট ভোটের ৫৫.৩ শতাংশ পড়েছে না ভোটের পক্ষে, আর ৪৪.৭ শতাং ভোট পড়েছে হ্যা এর পক্ষে।
গোটা ইংল্যান্ড এবং এমনকি গোটা পৃথিবী আরেকবার গভীর আগ্রহ ও উদ্বেগের সাথে তাকিয়ে ছিল স্কটল্যান্ড সংক্রান্ত এই গণভোটের দিকে। শ্বাসরূদ্ধকর এক সময় পার করেছিল শুধু ব্রিটেন-স্কটল্যান্ডবাসী নয়, বরং পৃথিবীর সকল সচেতন জনগণই তাকিয়ে ছিল এই ফলাফলের দিকে।
এবং শেষ পর্যন্ত ফলাফল বের হয়। দেখা যায়, শেষ পর্যন্ত স্কটিশরা স্বাধীনতার বিপক্ষেই তাদের ভোট দিয়েছে।
এবং মনে হয়েছে, এতে যারা স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্বের পক্ষে প্রকাশ্যে এবং মনেপ্রাণে অবস্থান নিয়েছিল তারা যেন কিছুটা হোচটই খেয়েছেন।
কিন্তু ফলাফলে বিমর্ষ এবং তার বিপরীতে বরঞ্চ উৎফুল্ল হবার কারণই আমার চোখে দৃশ্যমান হয়।
সংক্ষেপে বললে বলা যায়, এই রেফারেন্ডম প্রমাণ করলো, গণতন্ত্র বলতে যা বোঝায় তা যদি কার্যকর করার চেষ্টা করা হয় বা কার্যকর করা হয় তবে জনগণ নিজেদের ভবিষ্যত কল্যাণকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে তাদের মতামত প্রদর্শন করেন।
স্কটল্যান্ডের জনগণ গণভোটের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের অন্তর্ভূক্ত থেকে স্বাধীন অস্তিত্ব নিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এটা ঠিক। কিন্তু ব্রিটেন যে একটি গণতন্ত্রের দেশ, গণতন্ত্রের আবাসভূমি তা এই নির্বাচনের মাধ্যমে আরেকবার প্রমাণ করলো, তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে পারলেও ক্ষতি কী! ইংল্যান্ড বা গ্রেট ব্রিটেনে যে, অন্তত অন্যের মতামত বা বক্তব্যের প্রতি বা জনমতের প্রতি  শ্রদ্ধা সম্মান প্রদর্শন করে তা এই গণভোটের মাধ্যমে বোঝা গেল আরেকবার।

খবরে জানা গেল, স্কটল্যান্ডের বড় বড় শহরগুলোতে হ্যা ভোটের পক্ষে বেশি ভোট পরেছে। অর্থাৎ শহরের জনগণ চেয়েছেন স্বাধীনতা। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো, ড্যান্ডি, ল্যাংকাশায়ারের ভোটাররা ভোট দিয়েছেন হ্যা এর পক্ষে। অপরদিকে ছোটো ছোটো শহরের ভোটাররা ভোট দিয়েছেন না ভোটের পক্ষে।  বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে পড়ছিলাম, যখন হ্যা ভোটের পক্ষে এক শিক্ষক অথবা নাট্যকার প্রচারণা চালাচ্ছিলেন তখন পাশের এক শ্রমিক জোর গলায় বলছিলেন যে তিনি স্বাধীণতার বিপক্ষে বা না ভোটের পক্ষেই আছেন।
এই দৃষ্টান্তের দিকে খেয়াল করে বলা যায়, শ্রমিক বা যারা সেই অঞ্চলেল সত্যিকারের খেটে খাওয়া তারা কিন্তু সেই ‘জাতীয়তাবাদী’ চেতনার বিপরীতে বরং ‘শ্রেনী চেতনা’য় বেশি উদ্বুদ্ধ ও সচেতন।
এই উদাহরণের দিকে খেয়াল করলে কার্ল মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, মাও সে তুঙ-এর কথাই তো তবে সত্য প্রমাণিত হয়! কার্ল মার্কস তো বলেছিলেন, পুজি চায় জাতীয়তাবাদী চেতনা সৃষ্টির মাধ্যমে পুজিকে কুক্ষিগত করতে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের এই ক্ষয়িঞ্চু যুগে ‘শ্রেনী চেতনা’কে ‍উপেক্ষা করে শুধুমাত্র ‘জাতীয়তাবাদের চেতনা’ সমাজকে বা লড়াইকে এগিয়ে নিতে পারে না। তাই সকল সংগ্রামকেই এখন শ্রেনী চেতনার দিকে ধাবিত করতে হবে এটাই এখন বাস্তব বস্তুগত ও লড়াইগত এবং সাধারণ বাস্তবতা।
সুতরাং, এই রেফারেন্ডমের মাধ্যমে র্সংগ্রামের সেই লাইনগত সঠিকতাই আরেকবার যেন প্রমাণযোগ্য হয়ে গেল।
যাই হোক ভালো লেগেছে সার্বভৌম স্কটল্যান্ডের পক্ষে কাজ করেও স্কটল্যান্ড ন্যাশনাল পার্টিকে ইংল্যান্ড ‘স্বাধীনতা বিরোধী’রাষ্ট্রদ্রোহী’ আখ্যা প্রদান করেনি। বাংলাদেশের মতো দেশে এই ধরণের মতামত বা মত প্রদান করার ধৃষ্টতা হয়তো দেখালে সহজেই এই ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ ‘স্বাধীনতা বিরোধী’ তকমা আটা হয়ে যেত নিশ্চয়!

এভাবে অন্যের চরম মত ও পথকে শ্রদ্ধা দেখিয়ে যে ইংল্যান্ড টিকে রয়েছে তা থেকে শিক্ষা নিতে নিশ্চয় অন্য দেশ বা জাতি চেষ্টা করতে পারে।

Thursday, September 18, 2014

তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে - সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী




 ( ইস্টিশন নামক এক ব্লগে সাম্যবাদী নামক এক ব্লগার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী’র এই লেখাটি পোস্ট করেন। লেখাটি পড়ার পরে আমার মনে হয়েছে আরো অনেকের কাছে লেখাটির বক্তব্য যাওয়া দরকার। তাই নিজের ব্লগের লেখাটি কপিপেস্ট করে শেয়ার করলাম। সাম্যবাদী ব্লগারের প্রতি কৃতজ্ঞতা রইল। ধন্যবাদ। মিঠুন চাকমা)
 
[ শুরুর কথা : ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪ শনিবার, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি মিলনায়তনে ‘তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন’ শীর্ষক এক বক্তৃতা অনুষ্ঠিত হয়। তাজউদ্দীন আহমদ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ফান্ডের সহযোগিতায় এই আয়োজন করে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। বক্তৃতা দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সুদীর্ঘ লিখিত এই বক্তৃতাটির সামাজিক এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব অনুধাবন করে তা এখানে তুলে ধরছি।]
।। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ।।
তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক সাফল্য ও অবদান সম্পর্কে আমরা সবাই অবহিত। প্রশ্ন থাকে দুটি। প্রথমটি, কেন তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হলেন এবং দ্বিতীয়টি, কোন ধরনের রাজনীতিতে তার আগ্রহ ছিল। রাজনীতিতে তার যুক্ত হওয়ার একাধিক কারণ আছে- একটি বাইরের, আরেকটি ভেতরের। বাইরের কারণটি মানুষটির ভেতরের গুণগুলোকে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং রাজনীতিতে যোগদান অপরিহার্য করে তুলেছে। কেবল যোগদান তো নয়, রাজনীতিই ছিল তার জীবনের মূল প্রবাহ।
বাইরের কারণটিকে বলা যেতে পারে যুগের হাওয়া; আর তার আত্মগত গুণগুলোর ভেতর প্রধান ছিল সংবেদনশীলতা এবং কর্তব্যজ্ঞান ও দায়িত্ববোধ। তাজউদ্দীন আহমদের জন্ম ১৯২৫ সালে, কিশোর বয়সেই তিনি চতুর্দিকে রাজনৈতিক তৎপরতা দেখেছেন; ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তখন জোরেশোরে চলছিল এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ক্রমাগত তীব্র হচ্ছিল। যুগের ওই হাওয়াতে তাজউদ্দীনের সংবেদনশীলতা এবং ভেতরের কর্তব্যজ্ঞান ও দায়িত্ববোধ সাড়া দিয়েছে। যার ফলে তিনি কৈশোরেই রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন।
১৯৪৪ সালে ম্যাট্রিক পাস করার পর তিনি কলেজে ভর্তি না হয়ে রাজনীতিতে চলে যান; প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা ছেড়েই দিয়েছিলেন; তিন বছর পরে মূলত মায়ের চাপে আইএ পড়া শুরু করেন। সরকারি ঢাকা কলেজেই ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু নিয়মিত ক্লাস করা হয়নি, রাজনৈতিক কাজের প্রতি আগ্রহের কারণে। যে জন্য একটি বেসরকারি কলেজ থেকে অনিয়মিত ছাত্র হিসেবে পরীক্ষা দিতে হয়েছিল। অথচ ছাত্র হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং গ্রন্থপাঠে আগ্রহ ছিল অপ্রতিরোধ্য। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় তিনি দ্বাদশ স্থান পেয়েছিলেন। সেটি অবিভক্ত বাংলার ঘটনা, তখন মাধ্যমিক পরীক্ষায় বোর্ড ছিল একটাই। পরে ১৯৪৮ সালে আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, চতুর্থ স্থান অধিকার করে। এর পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন অর্থনীতিতে অনার্স পড়বেন বলে। সময়মতো পরীক্ষা দেওয়া হলো না; রাজনৈতিক কারণেই। এক বছর পরে পরীক্ষা দিয়ে পাস করলেন, ভর্তি হলেন আইন বিভাগে। যখন আইন পড়ছেন তখন তিনি ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য; সদস্যদের ভেতর বয়সের দিক থেকে সম্ভবত সর্বকনিষ্ঠ। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে কারাগারে যেতে হয়েছে, আইনে ডিগ্রির জন্য পরীক্ষা দিতে হয় বন্দী অবস্থা থেকেই। রাজনীতি তাকে ছাড়েনি, তিনিও রাজনীতিকে ছাড়েননি। জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতেই ছিলেন; ওই রাজনীতিতে দক্ষিণ ও বামের ব্যবধান ছিল, স্পষ্ট ব্যবধান। জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে ওটি তো থাকবেই, কমরেড মুজফ্ফর আহমদ তার আত্মজীবনীতে মন্তব্য করেছেন যে, উপমহাদেশের কমিউনিস্টদের ভেতরেও দক্ষিণপন্থীরা ছিলেন, যেমন ছিলেন বামপন্থীরা। তাজউদ্দীন আহমদের অবস্থান জাতীয়তাবাদের বামপন্থী সীমান্তে; সে সীমান্তটি পার হয়ে যাওয়া যায় কি না, সে চেষ্টা নিশ্চয়ই করতেন, যদি না তার অকালপ্রয়াণ ঘটত। তিনি তো চলে গেলেন মাত্র ৫০ বছর বয়সে।
যুগের হাওয়াটা বেশ প্রবল ছিল সন্দেহ কী। কিন্তু সবাই তো তাতে সমানভাবে সাড়া দেননি। রাজনীতিকে সার্বক্ষণিক কাজ ও চিন্তা হিসেবে যারা গ্রহণ করেছেন, তাদের সংখ্যা স্বল্পই ছিল। রাজনীতি করলে এখন যেমন সুযোগ-সুবিধা লাভের সম্ভাবনা থাকে, তার সময়ে তেমনটা একেবারেই ছিল না। রাজনীতি তখন অসুবিধার আকর, বিপদের প্রত্যক্ষ ঝুঁকি। অথচ সেই অসুবিধার পথেই তিনি চলে গেলেন, দ্বিধা না করে। ইচ্ছা করলে অন্য পেশায় যেতে পারতেন এবং যেটাতেই যেতেন মেধা ও পরিশ্রমের যে সমন্বয় তার ভেতর ছিল, তাতে শীর্ষেই পৌঁছবার কথা। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে আমলা হতে পারতেন, মেধাবান তরুণদের পক্ষে ওই দিকেই ছোটাছুটি করাটা ছিল সাধারণ প্রবণতা। আইনজীবী হওয়ার পথও খোলাই ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবার পথে কোনো বিঘœ ছিল না। বিষয়সম্পত্তি ছিল; উত্তরাধিকার সূত্রে জায়গা জমি, চরভূমি এবং বন পেয়েছেন; সেখানে ধান, পাট, রবি শস্যের চাষ হয়। বনের কাঠ বিক্রি করে টাকা আসে। পারিবারিক আয়ের ওপর ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয়। তাদের এলাকায় বেপারীরা ছিলেন বিত্তশালী। তাজউদ্দীনও পারতেন ব্যবসা-বাণিজ্যে যেতে এবং তাতে ধনপ্রাচুর্য অর্জন ছিল অবধারিত। কিন্তু ওসব দিকে না গিয়ে রাজনীতিতে এসেছিলেন, ভেতরের সংবেদনশীলতা, কর্তব্যজ্ঞান ও দায়িত্ববোধের তাড়নায়।
সংবেদনশীলতার দিকটায় তাকানো যাক। তার অনুভূতির জগতের খবর পাওয়া যাবে নিয়মিতভাবে লেখা তার ডায়েরিতে। ডায়েরি তিনি ইংরেজিতে লিখেছেন; কবি বেলাল চৌধুরীর দ্বারা বাংলায় অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। ইংরেজিতে লেখার একটা কারণ, হয়তো এটা ওই ভাষার চর্চা তখন স্বাভাবিক রীতি ছিল। তাছাড়া তিনি মিশনারীদের স্কুলে পড়েছেন, সেখানে গোটা গোটা অক্ষরে ইংরেজি লেখার একটা অভ্যাস গড়ে উঠেছিল। আরেকটা কারণ হতে পারে আবেগকে সংযত রাখা এবং নিজেকে নৈর্ব্যক্তিকভাবে দেখতে চেষ্টা করা। বাংলায় লিখলে হয়তো বাক্সংযম অতটা রক্ষা করা কঠিন হতো, যতটা তিনি রক্ষা করেছেন। তবুও মাঝে মাঝে দেখা যায়, আপনজনদের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত ব্যবহার পেয়ে মুষড়ে পড়েছেন। কনিষ্ঠ ভ্রাতার সঙ্গে হঠাৎ করে দুর্ব্যবহারে তার রাতের ঘুম নষ্ট হয়েছে।
এগুলো ব্যক্তিগত ব্যাপার। বাইরে বস্তুগত জগতের অন্তত চারটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, যা থেকে তার অন্তর্জগতের প্রকৃতির আভাস পাওয়া যায়। ২৪ আগস্ট ১৯৪৭-এ লিখছেন যে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনের প্রবেশপথে দেখেন মৃত্যুপথযাত্রী এক বৃদ্ধা উলঙ্গ অবস্থায় পড়ে আছেন। সঙ্গে সঙ্গে মিটফোর্ড হাসপাতালে টেলিফোন করলেন। কেউ সাড়া দিল না। তখন এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানালেন এ ব্যাপারে তাদের কিছু করার নেই; পরামর্শ দিলেন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। মুসলিম লীগ অফিসে গিয়ে এসিস্ট্যান্ট স্টেশন মাস্টারকে ফোন করলেন; তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানালেন। এরপরে স্টেশনে গিয়ে দেখেন মহিলা সেখানেই পড়ে আছেন। কর্তাদের সঙ্গে দেখা করলে একজন আরেকজনকে নোট লিখলেন। বোঝা গেল কেউ কর্ণপাত করছে না। নোটের কপি নিয়ে তারা ওপরের অফিসারের সঙ্গে দেখা করলেন। অফিসারটি যথার্থ কর্তৃপক্ষের কাছে একটি নোট দিলেন। এভাবে একটি জীবনের ওপর সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত আমলাতন্ত্রীয় দৌরাত্ম্য চলল। সন্ধ্যায় মহিলাকে আর পাওয়া গেল না। তাজউদ্দীন লেখেননি, আমরা অনুমান করি যে মহিলা বাঁচেননি, হয়তো তাকে বাঁচানো যেত যদি কর্তৃপক্ষ কর্তব্যজ্ঞানের পরিচয় দিত।
এটি রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতাপ্রাপ্তির দ্বিতীয় সপ্তাহের ঘটনা। তরুণ তাজউদ্দীন তখন সবে কলেজে ভর্তি হয়েছেন। ডায়েরিতে বিবরণগুলো এমনিতে খুবই সংক্ষিপ্ত; কিন্তু এটিকে বিস্তারিত করে লিখেছেন। বোঝা যায় তিনি কতটা আহত ও বিচলিত হয়েছেন। স্বাধীনতার প্রকৃত চেহারাটা দেখতে পেয়েছেন, বুঝেছেন নতুন রাষ্ট্র কতটা মানবিক হবে! কিন্তু নিজের সংবেদনশীলতা ও কর্তব্যজ্ঞানের যে পরিচয় নিজেই নিজের কাছে দিয়েছেন, সেটা তাকে অধিকতর রাজনীতিমনস্ক করেছে, এমন কথা আমরা অবশ্যই বলতে পারি। ডায়েরির লেখাগুলো সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। কাউকে জানাবার জন্য লেখেননি, এতে যা লিপিবদ্ধ আছে তা আমাদের পড়ার কথা নয়; কিন্তু পড়লে নিশ্চিত বুঝি, তাজউদ্দীন আহমদ কেন রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। যে রাষ্ট্র দুস্থ মানুষের যত্ন না নিয়ে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, তাকে না-বদলালে যে মানুষের মুক্তি নেই, এমন বক্তব্য কোথাও বাহুল্য সহকারে ব্যক্ত হয়নি, কিন্তু ওই উপলব্ধিটা যে তাকে তাড়া করে ফিরছে এটা বুঝতে কোনো অসুবিধা নেই।
ওপরে উদ্ধৃত বিবরণের তুলনায় বিস্তৃত আকারে আছে গান্ধীজীর মৃত্যুতে অনুভূতির কথা। ৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮-এর সন্ধ্যায় খবরটি পান। ওই দিনের এবং পরের দিনের দিনলিপিতে গান্ধীর মৃত্যু সম্পর্কে তথ্য রয়েছে; কিন্তু যা লক্ষ করবার বিষয় তা হলো, এমন বিস্তারিত বিবরণ তার ডায়েরিগুলোর অন্য কোথাও নেই, এমন শোকপ্রকাশও নয়। শোক অবশ্য ছিল সর্বজনীন। তাজউদ্দীনের বিবরণীতেই রয়েছে এ তথ্য যে ঢাকা শহরে সেদিন স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়েছে, যেটা ছিল অভাবিত। পত্রিকার জন্য কাড়াকাড়ির অমন দৃশ্যও আগে কখনো দেখা যায়নি।
ধারণা করি, এর পেছনে অন্তত তিনটি কারণ ছিল। তিনটিই বোধের ব্যাপার। প্রথমটি স্বস্তির, দ্বিতীয়টি কৃতজ্ঞতার, তৃতীয়টি গ্লানির। স্বস্তি এই জন্য যে, গান্ধীজী কোনো মুসলমানের হাতে নিহত হননি, ঘাতকেরা ছিল কট্টরপন্থী হিন্দু। কৃতজ্ঞতার বোধ এসেছিল এই জ্ঞান থেকে যে, তিনি প্রাণ দিয়েছেন ভারতে, বিপন্ন মুসলমানদেরকে রক্ষা করতে গিয়ে। আর গ্লানির উদ্ভব এই সচেতনতা থেকে যে, পাকিস্তানের দাবি প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে গান্ধীকে মুসলমানদের চরম শত্র“ বলে দেখা হয়েছে। এই শেষের বোধটির উল্লেখ তাজউদ্দীনের দিনলিপিতেও রয়েছে। লিখেছেন, ‘বিগত দিনে আমিই তো এই মহৎ আত্মার বিরুদ্ধে কত কথা বলেছি। অন্তরের বিশ্বাস থেকে নয়, রাজনীতি থেকে।’
শোক অন্যরাও অনুভব করেছেন, কিন্তু তাজউদ্দীনের শোক ছিল এমন গভীর, যা তার নিজের কাছেও বিস্ময়কর। মৃত্যুশোক তাকে যে খুব একটা অভিভূত করে এমন নয়। বিষয়টি তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন। চার বছর আগে তার বড় ভাইয়ের মৃত্যুতে, এমনকি এক বছর আগে পিতার মৃত্যুতেও তিনি যে ভেঙে পড়েছিলেন, এমনটা মোটেই নয়। নিজের জন্য নিজেই লিখে রেখেছেন-
'কিন্তু গান্ধীজীর মৃত্যুতে আমি তেমনটি হতে পারছিনে কেন? আমি আমার মনের বিষাদকে দুর্বলতা ভেবে ঝেড়ে ফেলতে চাইলাম। অনিচ্ছা নিয়ে আমি রাত ১২টায় রাতের খাওয়া খেলাম। আমি ঘুমাতে চাইলাম। কিন্তু তবু তো আমি ঘুমাতে পারলাম না। জাগ্রত অবস্থাতে গান্ধীজী আমাকে আপ্লুত করে রাখলেন। স্নায়ু বিবশ হলো। আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন হলাম। কিন্তু তন্দ্রার মধ্যেও তো গান্ধীজী আমাকে আপ্লুত করে রাখলেন।'
পরের দিনের বিবরণীতেও এই শোকের কথা লিখেছেন। নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, ‘আমার আর কিছু না থাক চুল আঁচড়াবার বিলাস আছে। হোক সামান্য; তবু তো বিলাস। আজ কিন্তু সেটুকুও আর রইল না। আজ আর আমার গোসল হল না। ৪৮ ঘণ্টা ধরে আর কেশবিন্যাস ঘটল না।’
ব্যক্তিগত ঘটনার তুলনায় রাজনৈতিক ঘটনায় তাজউদ্দীনের শোকের এই গভীরতর অনুভবের একটা ব্যাখ্যা দিনলিপিতে রয়েছে। সেটা এই যে, গান্ধীজী ছিলেন পথপ্রদর্শক। ২৩ বছর বয়সের ওই যুবক ইতিমধ্যেই রাজনীতিকে অন্য সব বিবেচনার ঊর্ধ্বে রাখার অভ্যাস করে ফেলেছেন, যে জন্য পারিবারিক শোকের চেয়ে রাজনৈতিক শোক তার কাছে বড় হয়ে উঠেছে। রাজনীতিতে পথপ্রদর্শক হিসেবেও অন্য কাউকে তিনি সামনে দেখতে পাননি। বুঝতে পারি যে, কায়েদে আজম তার কাছে দলীয় কারণে বড় ছিলেন, ব্যক্তিগত মহত্ত্বের কারণে নয়। সোহরাওয়ার্দীকে তার খুব বড় মনে হয়নি, যার প্রমাণ তার দিনিলিপিতেই আছে। মওলানা ভাসানীর বক্তৃতা তার পছন্দ, কিন্তু মওলানা আসামে ছিলেন, সদ্য এসেছেন, তার নেতৃত্বদান তখনো তেমনভাবে শুরু হয়নি। এই শূন্যতার ভেতরে অবস্থানরত যুবকটির কাছে মনে হয়েছে যে, ‘পথের দিশারী আলোকবর্তিকা’টি অস্তমিত হলো।
শোকের এই অনুভূতি তার ভেতরের সংবেদনশীলতার খবরটিও আমাদেরকে জানিয়ে দেয়। সংবেদনশীলতার প্রকাশ আরও আছে। ধরা যাক সলিমুল্লাহ এতিমখানার ধর্মঘটী ছাত্রদের ব্যাপারটা। তাদের কয়েকজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ফলে এতিম ছেলেগুলো আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে রাজনীতিতে তখন যারা নেতৃস্থানীয়, তারা কেউই এতিমদের ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ২৮ নভেম্বর ১৯৪৭-এর দিনলিপিতে ‘বিশেষ দ্রষ্টব্য’ দিয়ে তাজউদ্দীন লিখছেন-
'এসব দরিদ্র এতিম ছেলেদের জন্য কেউ এতিমখানার ক্ষমতাধর ভদ্রলোকদের সঙ্গে ঝগড়া করতে এগিয়ে আসবে বলে মনে হচ্ছে না। যদিও অতীতে দেখা গেছে আমরা [...] গুরুত্বহীন বিষয়ে কত চেষ্টাই না করেছি। আমরা সংসদীয় রাজনীতির জন্য সময় দিতে পারি। কিন্তু যখন এসব ছেলেদের জন্য কিছু করতে চাই তখন সময়ের প্রশ্ন আসে। এক্ষেত্রে আমরা আমাদের বিবেক ও স্বার্থের সাথে প্রতারণা করছি। আমাদের সব ভালো ভালো কথা জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য। নির্দোষ ছেলেরা! আমরা ভালোভাবেই জানি তাদের জন্য কিছুই করতে পারব না।'
স্পষ্টতই সংবেদনশীল এই তরুণ যে ধরনের রাজনীতিতে যুক্ত থাকতে চাইছেন সেটা ক্ষমতা, খ্যাতি, প্রতিপত্তি, সম্পদ ইত্যাদি লাভের জন্য নয়; সেটি হলো সমাজব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনার জন্য। সে জন্যই তার প্রস্তুতি চলছে, নীরবে।
রাজনৈতিক কারণে ব্যস্ততার দরুন বিএ অনার্স পরীক্ষা দিতে পারেননি; শিক্ষকতার কাজ নিয়েছেন শ্রীপুর স্কুলে। সে স্কুলের অবস্থা খুবই খুবই সঙ্গীন। বেতন ১০০, তা-ও নিয়মিত পাবেন কি না, সন্দেহ। প্রধান শিক্ষক তহবিলের নয়-ছয় করছেন বলে অভিযোগ। এরই মধ্যে তাজউদ্দীন চেষ্টা করছেন স্কুলটিকে দাঁড় করাতে। নিয়মিত শিক্ষা দানের পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গ্রান্ট ইন এইডের জন্য দরখাস্ত, সব চলছে। উদ্যোগটা তারই। কিন্তু একটা সময় এলো যখন তাকে বিদায় নিতে হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে গিয়ে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের প্রয়োজনে।
তার কন্যা শারমিন আহমদ তাজউদ্দীন আহমদ : নেতা ও পিতা নামে যে বইটি লিখেছেন, তা থেকে আভাস পাওয়া যায় যে, তার এই ছাত্রজীবনে প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে রাজনীতির কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা জড়িত ছিল। প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক পরিষদের নির্বাচন আসছে, তাতে তিনি প্রার্থী হবেন; স্নাতক ডিগ্রী না থাকলে পাছে প্রার্থিতা অগ্রাহ্য হয়, এই শঙ্কাটিই ছিল তার জন্য মুখ্য বিবেচনা। শিক্ষকতা তার খারাপ লাগছিল না, ছাত্রদের সঙ্গে যে সম্পর্কটি স্থাপিত হয়েছিল, তা নিবিড় বন্ধুত্বের, তবু এক বছর তিন মাস তিন দিন পরে তাকে স্কুলটি ছেড়ে শহরে ফিরে যেতে হলো। তার বিদায় উপলক্ষে ১০-১১-১৯৫২ তারিখে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। স্বভাবতই তার কিছু বলার কথা। তাজউদ্দীন লিখছেন-
'আমি আমার আবেগ সামলাতে পারলাম না। প্রায় ১০ মিনিট আমি কোনো শব্দই উচ্চারণ করতে পারলাম না। আমার কণ্ঠ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে এল। আগে কখনো আমি এভাবে আপ্লুত হইনি। ছেলেরা সবাই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল, শিক্ষকরাও। অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র আবদুল বাতেন ফুলের মালা পরিয়ে দিল। মালার সজীব ফুলগুলো অচিরেই শুকিয়ে যাবে, কিন্তু ছেলেদের ভালোবাসার স্মৃতি আমার হৃদয়ে চির সতেজ থাকবে।'
রেল স্টেশনে শিক্ষক ও ছাত্ররা সবাই এসেছে। তাজউদ্দীন দেখছেন যে তিনি ছেলেদের মুখের পানে চোখ তুলে তাকাতে পারছেন না। এ ছিল তার জন্য এক মর্মস্পর্শী ঘটনা। ঢাকায় পৌঁছে রাত তিনটায় দিনলিপি লেখার সময়েও তীব্র মর্মবেদনা থেকে মুক্ত হতে পারেননি, চিন্তার স্বাভাবিক গতিই হারিয়ে ফেলেছিলেন। অথচ মানুষটি তো অত্যন্ত দৃঢ়চেতা, কিছুতেই বিচলিত হন না, ভেঙে পড়েন না, একাত্তরের যুদ্ধে যখন অপ্রত্যাশিত, অনিশ্চিত, বিপজ্জনক এবং ইতিহাস-নির্মাণকারী একটি দায়িত্ব তাকে কাঁধে নিতে হয়েছিল, তখনো চিন্তার খেই হারাননি, এবং স্কুল শিক্ষকতার সেই অনভিজ্ঞ সময়েই অনায়াসে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাবিষয়ক সমস্যা নিয়ে এক থেকে দেড় ঘণ্টা ধরে বক্তৃতা করেছেন, এক দেড় হাজার শ্রোতার সামনে। এই সংবেদনশীলতা তাকে রাজনীতিতে যোগ দিতে বাধ্য করেছে, এবং এই সংবেদনশীলতাকে তিনি তার রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি স্তরে ও সঙ্কটে অতিযত্নের সঙ্গে রক্ষা করেছেন।
দুই
বাইশ বছর বযসে তিনি পিতৃহীন হন। তখন অভিভাবকহীনতায় শোকের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল দায়িত্ববোধ। দায়িত্বটা যে সামান্য ছিল, তা নয়। পিতার অমতেই তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন। ছাত্ররাজনীতি নয়, জাতীয় রাজনীতি। পিতা যখন মারা যান তখন তিনি কলকাতায়, মুসলিম লীগের কাজে। দায়িত্ব এসে পড়ল সম্পত্তি রক্ষা করার, চাষবাস ও উৎপাদিত পণ্যের কেনাবেচার দিকে লক্ষ্য রাখার। সবচেয়ে বড় ব্যাপার দাঁড়াল পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে অতি অল্প বয়সেই একমাত্র অভিভাবকের দায়িত্বটা কাঁধে তুলে নেওয়া। সংসারে মা আছেন, দুই ভাই আছে, আছে অবিবাহিত দুই বোন, আশ্রয়-পেতে-অভ্যস্ত এমন মানুষও রয়েছে। এসব দায়িত্বের কথা আমাদের জানার কথা নয়। এ নিয়ে অন্যের কাছে বাকবিস্তার ছিল তার স্বভাববিরুদ্ধ। নিষেধ ছিল অন্তর্গত আত্মসম্মানবোধের। দিনলিপি পড়ে খবরগুলো এখন আমরা পাই। এবং তাকে বুঝতে পারি। দেখি যে পারিবারিক প্রত্যেকটি কর্তব্য নির্ভুল নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি পালন করেছেন, অবিচল চিত্তে।
কর্তব্যপরায়ণতা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের অনেক ঘটনার উল্লেখ আছে দিনপঞ্জিতে। ২৪ মার্চ ১৯৫২-এর ঘটনা। বাড়ির একটি চালাঘরে আগুন লেগেছে। মিস্ত্রিরা কাজ করছিল, তাদের কুপি থেকেই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত। সবাই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাজউদ্দীন এগিয়ে গেলেন, হাত দিলেন মাচানের তক্তা রক্ষা করার কাজে। তখন অন্যরাও হাত লাগালো। কিছু কিছু তক্তা বাঁচানো গেল। ২৭ মার্চ ১৯৫৪-এর দিনলিপিতে আছে : “আমাদের পুকুরের পানিতে কাঠ ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল। সেই কাঠের রস পচে পানি দূষিত হওয়ায় মাছগুলো অস্থির হয়ে পড়েছিল এবং গতকাল রাত থেকে মাছ মরে যাচ্ছে। পানি ঠিক রাখার জন্য আমি কলাগাছ কেটে পানিতে ফেললাম। কলাগাছ পানির পচন ঠেকাবে।” ১৭ বছর পর ’৭৫ সালের ২৫ মার্চের ভয়াবহ রাত্রিতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও বিচলিত না হয়ে দায়িত্ব গ্রহণের যে কাজটি তাকে করতে হয়েছে, এ যেন তারই প্রস্তুতি ও পূর্বাভাস।
তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা সবাই রাজনৈতিক। দেখা যাচ্ছে তারা বিয়ে করছেন। মোহাম্মদ তোয়াহা, ডা. করিম, আবদুল জলিল- এরা ঢাকায় সংসার জীবন শুরু করে দিয়েছেন, তাজউদ্দীন এদের বাসায় যান, থাকেন কখনো কখনো, ভাবীদের সঙ্গে তার আলাপ হয়। নানাদিক থেকে তার নিজের ওপর চাপ আসছে বিয়ের; কিন্তু তার দিক থেকে চিন্তা বোন দুটির বিয়ে নিয়ে। মেয়েদের, বিশেষ করে যারা গ্রামে বসবাস করে তাদের জন্য তখন তো বিবাহিত হবার বাইরে অন্যকিছু ভাবার অবকাশ ছিল না। সম্ভ্রান্ত পরিবার, তাই বিয়ের প্রস্তাব আসছে। সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাজউদ্দীনকেই, শুভ-অশুভের সব দায়দায়িত্ব তার কাঁধেই। তিনি খোঁজখবর নিচ্ছেন, কোনো কোনো প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিচ্ছেন, কাউকে জানাচ্ছেন পরে জানাবেন। শেষ পর্যন্ত দুজনের ভেতর বড় যে বোনটি তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেলে ঘরবাড়ি ঠিকঠাক সাফসুতরো করা, আসবাবপত্র সাজানো সব করছেন, নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এবং হাত লাগিয়েও বৈকি। দাওয়াত দিচ্ছেন মানুষের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে।
কালিগঞ্জের দরদরিয়া গ্রাম তখন বেশ দুর্গম ছিল। সেজন্য ছোট বোনটির বিয়ের দিন পাত্রপক্ষের লোকদের আসতে বেশ বিলম্ব ঘটেছে। শেষ দলটি এসে পৌঁছাল সন্ধ্যা ৭টায়। মেহমানদের সংখ্যা ছিল অপ্রত্যাশিত। যাতায়াতের জন্য তখন হাতির ব্যবহার চালু ছিল; কয়েকজন এসেছে হাতিতে চেপে, সঙ্গে তিনজন মাহুত। তাজউদ্দীন লিখে রেখেছেন, “যা-ই হোক, আমরা রাতে বেশ ভালোভাবে অতিথিদের আপ্যায়ন করলাম। অনাড়ম্বরভাবে ভাত-মাছ পরিবেশন করা হলো।” সে-রাতে বিছানায় যেতে তার রাত একটা বেজেছে। পরের দিন ঠিক ভোর সাড়ে পাঁচটায় উঠেছেন। উঠে তাজউদ্দীন লিখে রেখেছেন, ‘নাস্তা তৈরিতে মাকে সাহায্য করলাম। সকাল ৭টায় বেশ ভালোভাবে নাস্তা পরিবেশন করা হলো।’
তিন
এই যে দুটি জগৎ, একটি গ্রামের অপরটি ঢাকার, তারা পরস্পর থেকে বহু দূরে অবস্থিত। সে সময়ে ঢাকা মফস্বল বৈ নয়, তবু সেটি রাজধানী। গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন। গ্রামে যাতায়াত-ব্যবস্থার অপ্রতুলতা আছে, রয়েছে বহুযুগের ভুতুড়ে অবজ্ঞা ও অবহেলা। শ্রীপুরের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ আছে, কিন্তু তার বাইরে সবটাই অন্ধকার। এলাকার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ফরেস্ট রেঞ্জারের অফিস, থানা, পোস্ট অফিস, রেল স্টেশন, স্যানিটারি অফিসারের দপ্তর ইত্যাদি। দেখা যাচ্ছে স্যানিটারি ইনসপেক্টর একজন বেশ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। কারও সঙ্গে বসে যে আলাপ আলোচনা করবেন, এমন জায়গা নেই। স্টেশন, পথের ধার, চায়ের দোকান, এমনকি ব্যবসায়ীর গুদামঘরকেও ব্যবহার করতে হয়। আছে দুর্নীতি, চুরি, ডাকাতির সমস্যা। তাজউদ্দীন উদ্যোগী হয়ে একটি ক্লাব গঠন করেছেন; সেখানে বসে অন্তত দাবা খেলা চলে। চলাফেরা পায়ে হেঁটে, নৌকায় কিংবা সাইকেলে। তাজউদ্দীন এই জগতকে অবজ্ঞা করেন না, একে ভালোবাসেন এবং বদলাতে চান। শিক্ষার কথা ভাবেন, অভিন্ন রীতির শিক্ষা চান, কিন্তু শিক্ষাই যে যথেষ্ট হবে না, তা পরিষ্কারভাবে জানেন। জানেন বলেই তিনি রাজনীতিতে ঝুঁকেছেন।
ঢাকার ভুবনটা আলাদা। সেখানে তিনি যাঁদের সঙ্গে ওঠাবসা করেন তারা সবাই উচ্চশিক্ষিত। কেউ কেউ রাজনৈতিক নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত, কেউবা নেতৃত্ব দেবেন ভবিষ্যতে। এদের সঙ্গে দেখা হয়। কারও বাসায়, কারও চেম্বারে, প্রশস্ত একটি ক্ষেত্র হচ্ছে বার লাইব্রেরি। ঢাকায় সিনেমা হল, বিমানবন্দর, রেস্টুরেন্ট, বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল অনেক কিছুই আছে। এখানে জনসভা হয়, আলোচনা সভা বসে। আন্দোলনের কর্মসূচি ও সংগঠনের গঠনতন্ত্র প্রণয়ন, কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন- সবকিছু ঘটে। তাজউদ্দীন আছেন দুয়ের সঙ্গেই যুক্ত। একটি ত্যাগ করে অপরটিতে চলে যাননি।
ওই দুই ভুবনের তফাৎটা বাসিন্দাদের নামগুলোর দিকে তাকালে পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে। এদের সবার উল্লেখই দিনপঞ্জিতে রয়েছে। ঢাকায় যারা থাকেন এবং আসা-যাওয়া করেন তারা হচ্ছেন কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, লিয়াকত আলী খান, খাজা নাজিমুদ্দীন, মওলানা আবদুল হামিদ ভাসানী, আবুল হাশিম, কামরুদ্দিন আহমদ, আতাউর রহমান খান, কফিলউদ্দিন চৌধুরী, তফাজ্জল আলী, অজিতকুমার গুহ, মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী, ‘পাকিস্তান অবজারভারে’র সম্পাদক আবদুস সালাম, ড. পি.সি চক্রবর্তী, অধ্যাপক আবুল কাসেম, ড. কাজী মোতাহের হোসেন, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, মওলানা আকরাম খাঁ, নূরুল আমিন, শেখ মুজিবুর রহমান, মোহাম্মদ তোয়াহা, মুনীর চৌধুরী, আবদুল মতিন, অলি আহাদ, ডা. এম. এ করিম। অন্যদিকের নামগুলোর মধ্যে আছে, গহর আলী গাড়িয়াল, মিয়ার বাপ, বুদাই দফাদার, হাসির বাপ, রাবিয়ার মা, হরিমোহন, লস্কর বেপারী, ফটিক, বড়– বেপারী, রহমত পণ্ডিত, তুফানিয়া, ইজ্জত আলী, লালু, লুদাই, শহীদ মোক্তার, খাজার বাপ, খাজা বেপারী, চেরাগ আলী মোড়ল, টুক্কা, হাওয়ার বাপ, করম আলী, মোতালিব দর্জি, কালু মোড়ল, আয়েশ আলী, আদম আলী, আক্কামিয়া, কাদিরের বাপ, সুবার বাপ, দুলার বাপ, ধনাই বেপারী, রঙ্গু, জাহার বাপ, জহুরা, নাস মিয়া, কাগু, সিরাজের মা, হুদাই, লালু, আনুর মা, পিরু মিয়া, বড়– বেপারী, নবা, নাজ মোড়ল, দেওয়ার বাপ, খাজুর বাপ, জাহার বাপ, আশু, আক্কা, আক্কাসের বাপ, ফটিক, আব্বাস আলী মাঝি, মোন্দর বাপ, জয়নার বাপ, রমিজার মা, খামি বেপারী, লেবু মোড়ল, চাঁদের বাপ, হারা জোগাল, রাম ভাওয়ালি, বলাই বাবু, ধনাই বেপারী। শিক্ষায়, অবস্থানে, মানে-মর্যাদায় ক্ষমতা-প্রতিপত্তিতে জগৎ দুটির একটি অপরটি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাতচল্লিশের স্বাধীনতা ওই দূরত্বটা বৃদ্ধি করেছিল, হ্রাস করার পরিবর্তে। তাজউদ্দীন আহমদের কাছে পল্লীগ্রামের ওই সাধারণ মানুষগুলোর কেউই উপেক্ষার পাত্র নন। যে কারণে তাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক, কাজকর্ম, ওঠাবসার কথা প্রতিদিন লিখে রাখেন নিজের দিনলিপিতে। তার দিনলিপি বলে যে, তাজউদ্দীনের জন্য রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য হিসেবে জাতির পিতা রাষ্ট্রপতি কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে সাক্ষাৎকারটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি উল্লেখযোগ্য হচ্ছে গ্রামের কৃষিজীবী মানুষের দাম্পত্য কলহের মীমাংসা করা।
খ্যাতিমান অ্যাডভোকেটের বসবার ঘরে বসে তিনি যেভাবে আলাপ করেন তেমনি স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন প্রতিবেশীদের সঙ্গে ক্ষেতের আলে, পাটখেতের পাশে, কৃষিজমিতে দাঁড়িয়ে কথা বলাতে। গ্রামে যারা জমির মালিক, তারাও ক্ষেতে নেমে ফসলের চারা লাগান, পাট ক্ষেতে নিড়ানি দেন, মরিচের ক্ষেতে আগাছা পরিষ্কার করেন। এদের সঙ্গে তো অবশ্যই, যে চাষি হাল চাষ করছে, যে-করাতি কাঠ কাটছে, তাদের সঙ্গেও তাজউদ্দীনের আলাপ হয়। বাড়ির বৈঠকখানায় যখন সবাই মিলে খেতে বসেন, তখন গৃহভৃত্যদেরকে ডেকে নেন পাশে। কোনো পক্ষেই সঙ্কোচ দেখা যায় না। এটা কোনো স্ববিরোধিতা নয়, দ্বৈত চরিত্রে অভিনয়ও নয়। এ হচ্ছে তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। তার কাছে গ্রাম ও শহর যেন একই গৃহস্থের অন্দরমহল ও বাইরের ঘর। কিন্তু বাস্তবে তো ঘটনা ভিন্ন প্রকারের। দুয়ের ভেতর তো খুব বড় রকমের পার্থক্য। আর সেটা রয়েছে বলেই তিনি সেই ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে চান এই দুই মহলকে যেটি আলাদা করে ফেলে; মাঝখানে দৃশ্য-অদৃশ্য ও কঠিন এক প্রাচীর খাড়া করে রাখে।
আমরা জানি, তিনি নিজেও আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন তার অজান্তে যে তিনি জামাকাপড় সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। ভালো দর্জির দোকানে জামা সেলাই করাচ্ছেন, কাপড় লন্ড্রিতে দিয়েছেন, এসব খবর তার দিনলিপিতে উল্লেখের মর্যাদা দাবি করেছে। কেশবিলাসের উল্লেখ দেখেছি, চুল কাটাচ্ছেন এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে। তার জন্য অত্যন্ত বিশিষ্ট ও সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন অ্যাডভোকেট কামরুদ্দীন আহমদ। এক সময়ে তিনি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন করতেন। সে সময়ে আমরা তাকে লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। সাধারণ নয়, দামি লুঙ্গি। পরবর্তীকালে তিনি রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন, তখন তার কী পরিধেয় ছিল জানি না, কিন্তু ৭০ সালে এবং ৭১-এর পরে তাকে ট্রাউজার্স শার্ট এবং স্যুটে দেখতে পেয়েছি। তাজউদ্দীন আহমদ কিন্তু পোশাক বদলানোর প্রয়োজনবোধ করেননি। যে জামাকাপড়ে শহরে আসতেন, সেই অবরণেই গ্রামে চলে যেতেন। পোশাক কোনো দূরত্বের সৃষ্টি করত না, যেমন করত না তার ইংরেজি জ্ঞান ও ইংরেজি ভাষাতে ব্যক্তিগত দিনলিপি লেখার অভ্যাস। তিনি এক ও অভিন্ন এক ব্যক্তি।
কিন্তু ওই যে দেওয়াল ভাঙার আবশ্যিকতা সেটা বুঝে নিয়েছিলেন রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ গ্রহণের ভেতর দিয়েই। বন বিভাগের প্রত্যক্ষ দুর্নীতি অসহ্য হওয়ায় তিনি মামলা করেছিলেন, প্রতিপক্ষ তার বিরুদ্ধে উল্টো মামলা দিয়ে তাকে হেনস্তা করার চেষ্টা করেছে। তার ছিল রোজকার দিনলিপি রোজ লেখার অভ্যাস, কিন্তু একবার তিন দিন সেটা লিখতে পারেন নি। কারণ মিথ্যা মামলার অন্যায় ব্যবস্থায় তাকে তিন দিন জেল হাজতে থাকতে হয়েছে। কারাবাসের অভিজ্ঞতা এটাই তার প্রথম; বলা যায় শুরু। আর দুর্নীতিবিরোধী এই সামাজিক আন্দোলন করতে গিয়েই এটা পরিষ্কারভাবে দেখতে পেয়েছেন তিনি যে সমস্যাটা আসলে রাজনৈতিক। রাষ্ট্র এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যরূপে জড়িত। ডায়েরিতে লিখছেন,
'বিচ্ছিন্ন ভাবে কোন আন্দোলন সম্ভব নয়। এতে ঘটনার সঙ্গে ঘটনা জড়িয়ে আন্দোলন নিস্তেজ হয়ে যায়। সমাজের কাঠামো এবং ব্যবস্থার যে কোন নির্দিষ্ট অংশ থেকে অন্যায় নির্মূল করার চেষ্টা সমস্যাটিকে আরো জটিলতার দিকে নিয়ে যায়। এতে সংস্কারকেরা অন্যদের দ্বারা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত হন। তাই একই সঙ্গে জোরালো আঘাত এবং আমূল পরিবর্তন এই অবস্থার সমাধান বলে মনে হয়। (২৫ মে ১৯৫০)।'
জনজীবনের স্থানীয় সমস্যাগুলো সম্পর্কে তিনি অত্যন্ত সচেতন। পঞ্চাশের মন্বন্তর তিনি দেখেছেন। তখন তার বয়স মাত্র ১৮। সেই বয়সেই গ্রামে পল্লীমঙ্গল সমিতি গঠন করেছেন, তার উদ্যোগে ধর্মগোলা স্থাপিত হয়েছে; উদ্দেশ্য ফসল কাটার সময়ে ধনী কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে গোলায় রাখা হবে, আপৎকালীন সাহায্যের জন্য। অভিনব পদক্ষেপ যে তাতে সন্দেহ কী। কিন্তু ওপরের উদ্ধৃতিতে যা ব্যক্ত হয়েছে সে-উপলব্ধি ওই সময়েই জন্মায়, যার তাড়নায় তিনি জাতীয় অর্থাৎ মুসলিম লীগ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।
মূল কথা, স্থানীয় সমস্যাকে তিনি রাষ্ট্রীয় সমস্যা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখেন নি, সেই সঙ্গে বুঝতে পারছেন যে, সংস্কারমূলক বিচ্ছিন্ন কাজে সাফল্য আসবে না, বরঞ্চ সংস্কারকারীদের বিপদ ঘটবার আশঙ্কা, যেমনটা তার বেলায় ঘটেছিল। তাই আন্দোলন করতে হবে রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের জন্য; আর সে-আন্দোলন বিভিন্ন ধারায় বিক্ষিপ্ত না হয়ে যদি একতাবদ্ধ হয় তা হলেই সাফল্য লাভের সম্ভাবনা, নইলে নয়। আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তিনি গ্রাম ও শহরের বিচ্ছিন্নতাকে ঘোঁচাতে চান। পথটা যে রাজনৈতিক সে-বিষয়ে তার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
ডায়েরির পাতাগুলো বলছে যে, তিনি জাতীয় রাজনীতিকে মনোযোগের সঙ্গে দেখছেন; এবং আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের ওপরও চোখ রাখছেন। তার চেষ্টা একই সঙ্গে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক হবার। ধরা যাক ডায়েরিতে একদিনের ঘটনাপঞ্জীর উল্লেখসমূহ। ৩১ মে ১৯৫১-এর বিবরণটা আমরা লক্ষ্য করতে পারি। ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে ওঠা দিয়ে শুরু, রাত এগারোটায় ঘুমাতে যাওয়া দিয়ে শেষ। এর ভেতরে যা যা ঘটেছে সবকিছুর উল্লেখ আছে, ধারাবাহিক ভাবে। আদালতে নারায়ণগঞ্জ শিল্প এলাকার সমবায় সমিতির কাজকর্মের ব্যাপারে শুনানি চলছে। তাজউদ্দীন যুক্তিতর্কগুলো শুনেছেন। সকালে শুনেছেন, দুপুরের পর আবার এসেছেন শুনতে। লিখছেন, “এই পর্বে পুলিশকে তাদের বেপরোয়া ও হঠকারী কার্যকলাপের জন্য তীক্ষ্ণ সমালোচনা হল। তাদের এই আচরণের ফলে শিল্পাঞ্চল এলাকা প্রায়োগিক অর্থে দেউলিয়া হতে চলছে। এটা উদ্বিগ্ন হবার বড় কারণ। তার এই যুক্তি যথার্থ।”
সব শেষে আছে আবহাওয়ার কথা, প্রতিদিনের ঘটনা বিবরণেই যা থাকে। এরও পরে বি. দ্র. দিয়ে পর পর পাঁচটি ঘটনার উল্লেখ দেখছি। “১. ইউএন ফোর্সের আগমনে চীন-কোরিয়ার ব্যাপারে বিপরীত অবস্থান নিয়েছে। ২. তেলখনি জাতীয়করণ করার ফলে তেহরানে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ৩. ধান ও চালের দাম বাড়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে। চাল ২৪/-, ধান ২২/- প্রতি মণ। ৪. [...] মেডিকেল ছাত্রদের ধর্মঘট শেষ হয়েছে। ৫. গত এপ্রিল থেকে প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকদের ধর্মঘট চলছে।” বুঝতে অসুবিধা নেই যে তার আগ্রহের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত, দেখতে পাই কেমন যতেœর সঙ্গে তিনি সমসাময়িক স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করছেন।
ঢাকা শহরে তার থাকার বন্দোবস্ত নেই। স্কলারশিপের টাকা পান; তা পর্যাপ্ত নয়। তাই লজিং-এ থাকতে হয়। সেটা কোনো সম্মানজনক ব্যবস্থা নয়, এতে থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে গৃহশিক্ষকতার দায়িত্ব থাকে। গ্রামের বাড়ি থেকে মাঝেমধ্যে কিছু টাকা আসে, তবে বোঝা যায় যে তা তিনি নিতে চান না। কমরেড ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট ছিল; সেটি বন্ধ হয়ে যাবে এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছে, অর্থাৎ সেখানকার সঞ্চয় হারানোর আশঙ্কা। কিন্তু এসব সমস্যা নিয়ে তিনি যে বিচলিত তা মনে হচ্ছেন না। লজিং-এ থাকতে হয় বলে তার ভেতর হীনমন্যতাবোধ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় ফজলুল হক হলে থাকতেন; কিন্তু এক পর্যায়ে হল ছেড়ে মেসে চলে যেতে হয়। কারণটা হাউজ টিউটরদের একজন সঠিক ভাবেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। অন্য একজনের মাধ্যমে তিনি সংবাদ পাঠিয়েছিলেন যে, অর্থাভাবই যদি তাজউদ্দীনের জন্য হলত্যাগের কারণ হয় তা হলে তাকে যেন জানানো হয়, তিনি সাহায্য করবেন।
তাজউদ্দীন অবশ্য সাহায্য নেননি; কিন্তু বোঝা তো যাচ্ছে যে কেবল ছাত্রদের মধ্যে নয়, শিক্ষকদের কাছেও তিনি ভালোবাসার পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। ঢাকায় থাকতে হবে এবং পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া চাই- এই দুই প্রয়োজন এক সঙ্গে মেটাবার জন্য তিনি এমন একটা উপায় বের করলেন যেটা অন্য কারো পক্ষে সম্ভব হতো কি না সন্দেহ। তার বন্ধু ডাক্তার এম এ করিম নতুন চেম্বার ও ফার্মেসি খুলেছেন, নাম দিয়েছেন কিশোর মেডিকেল হল, পরবর্তীতে যে-দোকান কেবল চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে নয়, রাজনৈতিক আলাপ আলোচনারও একটি কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছিল; বিশেষ করে কমিউনিস্টদের জন্য।
তাজউদ্দীন তার বন্ধুর ওই দোকানে যোগ দিলেন; অংশীদার নয়, কর্মী হিসাবে। একজন কম্পউন্ডারসহ দুপুরে বিরতি দিয়ে সকাল নটা থেকে রাত নটা পর্যন্ত দোকানের কাউন্টারে উপস্থিত থাকতেন। দোকানের কাছেই কামরা ভাড়া করে আবাস গড়ে তুললেন, পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি এবং দোকানের কাজ দু’টোই যাতে সমানে চলতে পারে। ওই দোকানেও গ্রামের লোকেরা আসতেন দেখা করতে, রাজনীতির বন্ধুরা আসতেন আলাপ করতে। পরে অবশ্য ডা. করিমের সঙ্গে পরামর্শ করে দোকানের সময় একবেলা করে নিয়েছিলেন যাতে সকালবেলাটা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যয় করা যায়।
বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি গুরুত্ব ও তাৎপর্য সকলেরই জানা। শুরু থেকেই তাজউদ্দীন ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন। সর্বদলীয় কর্মপরিষদে তার অবস্থান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। একুশে ফেব্র“য়ারিতে তিনি ঢাকায় ছিলেন না, ছিলেন স্কুলে, শ্রীপুরে। ঢাকার আসার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন সাত সকালেই, প্রথম ট্রেনটি ধরতে পারেননি অবাঞ্ছিত এক ঘটনার প্রতিবন্ধকতায়, রওনা হলেন ১২টা ১৪ মিনিটের ট্রেনে। ঢাকায় আসা জরুরি ছিল দুই কারণে। প্রথমটি ২১ ফেব্র“য়ারির প্রোগ্রাম ও দ্বিতীয়টি স্কুলের ব্যাপারে ডিপিআই ও এসডিও অফিসে জরুরি কাজ। ওই যে তার স্বভাব, কোনো দায়িত্বই অবহেলা করবেন না এবং স্থানীয় কাজকে মেলাবেন জাতীয় কাজের সঙ্গে, এদিনেও সেটা ঘটেছিল। ঢাকায় পৌঁছে মেডিকেল কলেজের সামনে ট্রেন থেকে নেমেছেন, শোনেন টিয়ার গ্যাস ছোঁড়ার বিষয়ে লোকে বলাবলি করছে। গুলিবর্ষণের ঘটনাটি তখনো ঘটেনি।
মেডিকেল কলেজের কাছে বিশ মিনিটের মতো থেমে তিনি দ্রুত চলে গেছেন প্রথমে ডিপিআইয়ের ও পরে এসডিও’র খাস কামরায়। এর পরে গেছেন আওয়ামী মুসলীম লীগের অফিসে; সেখানে পাঁচ মিনিট থেকে চলে গেছেন ড. করিমের চেম্বারে, তারপর করিমসহ মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে। চেষ্টা ছিল আহত ও নিহতদের খোঁজখবর নেওয়ার। পারলেন না। রাতের বেলায় ফিরে এলেন যুবলীগের অফিসে, যেটা তোয়াহার বাসস্থানও বটে। ভোর রাতে সেখানে পুলিশ এল তল্লাশি চালাতে। তাজউদ্দীন লিখছেন, ‘যুবলীগের অফিস লাগোয়া আমার শোবার ঘর, আমি ঘর থেকে সরে পড়ায় তারা আমার উপস্থিতি টের পায় নি।’ পরের দিন সকালে মেডিকেল ছাত্রাবাসে গেছেন, জনতা ও পুলিশের তৎপরতা দেখেছেন। মেডিকেল ছাত্রাবাসে সন্ধ্যা সোয়া সাতটা পর্যন্ত থেকে সাড়ে সাতটায় ফজলুল হক হলের এ্যাসেম্বলি হলে গেলেন এবং ছাত্রদের একটি সভায় সভাপতিত্ব করলেন। ২৩ তারিখে দেখা যাচ্ছে ডা. করিমের সাইকেল নিয়ে মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসে যাচ্ছেন এবং সেখান থেকে লিফলেট সংগ্রহ করে রেল স্টেশন, নারিন্দা, সদরঘাট, পাটুয়াটুলি হয়ে নবাব গেট পর্যন্ত সেগুলো বিলি করছেন। বাইশের রাতে আবারও পুলিশ এসেছিল যুবলীগের অফিসে, তারা প্রতিটি কক্ষ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তল্লাশি করল। তবে তাজউদ্দীন তাদের চোখ এড়াতে সক্ষম হন।
এই যে পুলিশের চোখকে ফাঁকি দেওয়া এবং যতক্ষণ পারা যায় গ্রেফতার এড়িয়ে চলা এই রণকৌশল গ্রহণের পরামর্শ এসেছিল দু’জন রাজনৈতিক সহকর্মীর কাছ থেকে। একজন শেখ মুজিবুর রহমান অপরজন সরদার ফজলুল করিম; প্রথমজন ছাত্রলীগের, দ্বিতীয়জন ছাত্র ফেডারেশনের। দুইজন দুই প্রান্তের। একজন জাতীয়তাবাদের বামধারার, অপরজন সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টির। ১৯৪৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্নবেতনভূক কর্মচারীদের সমর্থনে ছাত্রধর্মঘটে নেতৃত্বদানের অভিযোগে নেতৃস্থানীয় ছাত্রদেরকে শাস্তি দেওয়ার প্রতিবাদে উপাচার্যের ভবনে অবস্থান ধর্মঘট পালিত হয়। সেখানে পুলিশ এসে শেখ মুজিবসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এ বিষয়ে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন,
'তাজউদ্দীন আহমদ [...] আটকা পড়েছে। তাকে নিষেধ করা হয়েছে গ্রেফতার না হতে। তাজউদ্দীন বুদ্ধিমানের মতো কাজ করল। বলে দিল, ‘আমি প্রেস রিপোর্টার।’ একটা কাগজ বের করে কে কে গ্রেফতার হল তাদের নাম লিখতে শুরু করল। [...] আমাদের গাড়িতে তুলে একদম জেল গেটে নিয়ে আসল।'২
মর্মার্থে সরদার ফজলুল করিমের পরামর্শটিও গ্রেফতার এড়ানোরই, তবে পেছনের কারণটা ভিন্ন। এই ঘটনাটি ১৯৪৮এর। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পিকেটিং চলছিল সেক্রেটারিয়েটের গেটে। এক সাক্ষাৎকারে তাজউদ্দীন নিজেই বলেছেন-
'সরদার ফজলুল করিম ও আমি সেদিন বেশ কিছুক্ষণ একসাথে ছিলাম। তিনি আমাকে নেতাদের সাথে ঘুরতে নিষেধ করেছিলেন, কারণ তার ধারণা ছিল যে, কিছু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও ছাত্রেরা তাড়াতাড়ি গ্রেফতার হয়ে নাম অর্জনের চেষ্টা করবেন এবং সকলে একইভাবে গ্রেফতার হলে আন্দোলন বানচাল হবে।
পরামর্শদাতা এবং পরামর্শগ্রহণকারী উভয়েই সতর্ক ছিলেন, এবং কেউই গ্রেফতার হননি। তবে শামসুল হক, শেখ মুজিব, অলি আহাদ এবং আরো অনেকে গ্রেফতার হন।'৩
একাত্তরের পরিস্থিতি যদিও সম্পূর্ণ ভিন্ন, প্রশ্নটা তখন প্রায় বাঁচা-মরার, তবু তখনো দেখি ঘটনা একই প্রকারের; বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হচ্ছেন, তাজউদ্দীন গ্রেফতার এড়িয়ে মিশে যাচ্ছেন জনগণের সঙ্গে, আন্দোলনকে অব্যাহত রাখার স্বার্থে। একাত্তরে জনগণের সঙ্গে মিশে সীমান্ত অতিক্রম করার কালে তাজউদ্দীন তার স্ত্রীর কাছে একটি চিরকুট পাঠিয়েছিলেন, যাতে লেখা ছিল, “আমি চলে গেলাম। যাবার সময় কিছুই বলে আসতে পারি নি। মাফ করে দিও। আবার কবে দেখা হবে জানি না [...] মুক্তির পর। তুমি ছেলেমেয়ে নিয়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষের সঙ্গে মিশে যেও।”৪ চীনের বিপ্লবী গৃহযুদ্ধের সময় মাও সে তুং-ও তার সহযোদ্ধাদের একই ধরনের পরামর্শ দিতেন, বলতেন মাছ যেমন পানির সঙ্গে মিশে যায় বিপ্লবীদেরকেও তেমনি জনগণের সঙ্গে মিশে যেতে হবে। তাজউদ্দীন বিপ্লবী ছিলেন না, কিন্তু তিনিও জনগণের সঙ্গে মিশে থাকতেই পছন্দ করতেন।
একুশে ফেব্রুয়ারির দিন থেকেই দেখা যাচ্ছে তাজউদ্দীন কখনো নিজে সাইকেল চালিয়ে, কখনো অন্যের সাইকেলের পেছনে চেপে বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগ দিচ্ছেন। কর্মসূচি নির্ধারক কমিটির সভায় উপস্থিত থাকছেন। প্রচারপত্র বিলি করছেন। খবরাখবর নিচ্ছেন। আতাউর রহমান খানের খসড়া-করা একটা বিবৃতিকে চূড়ান্ত রূপ দিয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে পাঠাচ্ছেন। নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করছেন। বিভিন্ন জনের গ্রেফতারের খবর পাচ্ছেন এবং উদ্বিগ্ন হচ্ছেন। খোঁজ নিচ্ছেন। কিন্তু এতসব ব্যস্ততার মধ্যেও দিনলিপি লিখতে ভুলছেন না। ২৫ তারিখের দিনলিপিতে আছে-
'সাধারণ ধর্মঘট। রেল চলাচল ও সচিবালয়ে যোগদান ছাড়া প্রতিটি স্তরেই নজিরবিহীন সফলতা। মিছিল করার কোনো নির্দেশনা না থাকলেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা হয়েছে। ঢাকার প্রধান সড়ক প্রায় ১০ হাজার লোকের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে। [...] ১৪৪ ধারা মানার বিষয়টি কেউ আমলে আনল না। সামরিক ও সশস্ত্র বাহিনী ১৪৪ ধারা বলবৎ করতে হতাশাপূর্ণভাবে ব্যর্থ হলো। [...] নগরী চলে এল জনগণের আয়ত্তে। তবে কোথাও কোনো উচ্ছৃঙ্খলতা ছিল না, ছিল শুধু নূরুল আমিন সরকারের বিরুদ্ধে ক্রোধের প্রকাশ।'
অতিরঞ্জন নেই, ভাবাবেগ অনুপস্থিত; যে-আন্দোলনের সঙ্গে নিজে ওতপ্রোত জড়িত, তার সাফল্যের দিকটাকে দেখছেন পুরোপুরি বস্তুনিষ্ঠরূপে। অন্যত্র যেমন, এখানেও তেমনি- তিনি সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য। একই সঙ্গে তিনি ইতিহাসের দ্রষ্টা এবং সে ইতিহাস সৃষ্টিতে অংশগ্রহণকারী। কিন্তু ইতিহাস যে কেবল রাজনীতির ঘটনাবিবরণ নয়, তার পেছনে যে মানুষ আছে, রয়েছে তাদের জীবনযাপনের সমস্যা, তাজউদ্দীনের বোধ ও দৃষ্টি থেকে সে সত্যটা কখনোই হারিয়ে যায়নি। যেজন্য ঘটনামুখর ওই দিনগুলোতেও তিনি সাধারণ মানুষের জীবনে বিরাজমান অর্থনৈতিক সঙ্কটের বিষয়টিকে মনোযোগে রেখেছেন। ২৯ ফেব্রুয়ারির দিনলিপিতে বিশেষ দ্রষ্টব্য চিহ্ন দিয়ে লিখেছেন-
'১. ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগ থেকে পাটের দাম অস্বাভাবিকভাবে নেমে গেছে। [...] এ বছর চাষীরা তাদের নিজস্বমতো ও সরকারের প্রচারণার কারণে উচ্চমূল্য পাবার আশায় জরুরি প্রয়োজন সত্ত্বেও নিজেদের হাতে পাট ধরে রাখে। কৃষকের উচ্চমূল্য পাবার যে আশা ছিল, তা হৃদয়হীন কারবারীরা এখন উপভোগ করছে। কারবারীদের ষড়যন্ত্র এবং সরকারের চিন্তাভাবনা, পরিকল্পনাহীন মেকি সস্তা পরামর্শের কাছে চাষীদের নতি স্বীকার করতে হয়েছে। [...] পাটের এই দরপতন জাতীয় অর্থনীতির সকল ক্ষেত্রেই একেবারে আঘাত হেনেছে। সবার মনেই পুরো হতাশাবোধ বিরাজ করছে। পরিস্থিতি যদি না পাল্টায় তাহলে শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে পড়বে নিশ্চিতভাবেই। দেশীয় পণ্যের দামে নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে সে তুলনায় বিদেশি পণ্যের দাম আগের মতোই আছে।
২. যথেষ্ট অদ্ভুতভাবে ধানের মূল্য উঁচু, যেমনটা পাটের উচ্চমূল্যের সময় ছিল। লোকজন শঙ্কিত হয়ে উঠছে অর্থনৈতিক মন্দার ক্ষতিকর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের দিক থেকে কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। কিংবা বিষয়টি নিয়ে তারা আদৌ মাথা ঘামাচ্ছে কি না, তারও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে কয়েকজন এমএলএ সরকারের পাটনীতির বিরুদ্ধে মায়াকান্নার সুর তুলেছেন।'
সমসাময়িক ইতিহাস নিয়ে এমন ভাবে সে-কালের কতজন তরুণ ভেবেছেন আমরা জানি না। তবে অনেকে যে ভাবেননি সেটা নিশ্চয় করা বলা যায়, কারণ ভাবলে ইতিহাস বদলে যেত। তাজউদ্দীনের ডায়েরিতে প্রতিদিনের আবহাওয়ার নির্ভুল বর্ণনা রয়েছে। আবহাওয়ার ভালোমন্দকে তিনি নিজের ভালোলাগার মন্দলাগার দৃষ্টিতে যেমন দেখেছেন তেমনি দেখেছেন কৃষকের ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতেও। সে জন্য বৃষ্টি, ঝড়, প্লাবন, খরা- এসবে ধান, পাট, ও রবিশস্যের কতটা সুবিধা-অসুবিধা হবে তার কথা দিনলিপিতে লেখা আছে, নির্ভুল ভাবে, যেমন রয়েছে সামাজিক সম্পর্কের দ্বন্দ্ব, মৈত্রী, উদ্বেগ ও আনন্দের বর্ণনা। ইতিহাসের এই পাঠকটি জানতেন যে, অর্থনীতি ও সমাজকে বাদ দিয়ে ইতিহাসের কথা ভাবা অর্থহীন। পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষ তাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল রাষ্ট্র কেমন নিষ্ঠুর এবং বাঁচার জন্য সামাজিক উদ্যোগ কত প্রয়োজনীয়। সেই জ্ঞান থেকে তিনি কখনোই বিচ্যুত হননি।
একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনা সাধারণ মানুষকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল তার কথাও পাওয়া যাবে তার দিনলিপিতে। ১ মার্চ তারিখে তাজউদ্দীন শ্রীপুরে ফিরছিলেন। ট্রেনে এক বন্ধুর সম্পর্কে তিনি আন্দোলনের তাৎপর্য সম্পর্কে বলছিলেন। তার নিজের বিবরণীতে-
'আমি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এবং সরকারের জঘন্য ভূমিকা নিয়ে কথা বললাম। একজন হাবিলদারের নেতৃত্বে সশস্ত্র পুলিশের একটি দল আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনল। আমার ধারণা, সহানুভূতির খাতিরে হাবিলদার আমাকে এক গ্লাস খেজুরের রস সাধলেন।'
এর পরে আছে-
'বেলা সোয়া ২টায় শ্রীপুরে পৌঁছলাম। হাবিলদার আমাকে বিদায় জানালেন।'
মানুষকে প্রভাবিত করবার ক্ষমতাটা রাজনৈতিক নেতাদের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। তাজউদ্দীনের ভেতর সেটা ছিল সহজাত। শিক্ষিত-অশিক্ষিত সরকারি বেসরকারি সব ধরনের মানুষকে অতিসহজে কাছে টেনে নিতে পারতেন। তার অতিঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং রাজনীতিতে সহযোদ্ধা অলি আহাদের মূল্যায়ন আছে তার ডায়েরিতে। অলি আহাদের সততা, নিষ্ঠা, পরিশ্রমমনস্কতা, সবকিছুর অতিউচ্চ প্রশংসা করে তিনি সংশয় প্রকাশ করছেন বন্ধুটির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বিষয়ে। সাফল্যের জন্য দু’টি গুণের আবশ্যকতার কথা বলেছেন, একটি হলো নিজেকে অভ্রান্ত মনে না-করা এবং অপরটি অন্যের সঙ্গে ব্যবহারে নম্র থাকা। ডায়েরি জানায় যে, এ দু’টি গুণ তাজউদ্দীনের জন্য ছিল একান্ত স্বভাবজাত।
সিদ্ধান্তে তিনি কেমন অটল থাকতেন তার প্রমাণ তো একাত্তরের ইতিহাস-তৈরিতে তার অংশগ্রহণের পাতায় পাতায় লেখা আছে; কিন্তু দিনলিপিতে এ খবর পেয়ে যাই যে, সকল প্রয়োজনীয় বিষয়ে তিনি কেমনভাবে অন্যদের সঙ্গে আলাপ করছেন, মতামত জানতে চাচ্ছেন, পরামর্শ নিচ্ছেন। আর দেখি ওই যে নানা শ্রেণী ও পেশার অসংখ্য মানুষের সঙ্গে তার ওঠাবসা, চলাফেরা তাদের কোনো একজনের সম্পর্কেও কোনো কটু মন্তব্য নেই। কখনো কখনো কারো কারো আচরণে দুঃখ পেয়েছেন, মর্মাহত হয়েছেন, কিন্তু ব্যক্তিটির সম্বন্ধে নিন্দাসূচক একটি কথাও বলেন নি।
তাদের বংশগত উপাধি ছিল খান, ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফর্ম পূরণের সময় ‘খান’টিকে পরিত্যাগ করেছেন। অনেকের ধারণা, খানের সঙ্গে খান বাহাদুর খান সাহেব ইত্যাদির তকমার যোগ থাকার কারণেই পরিত্যাগকরণ। আরেকটা কারণ থাকতে পারে, সেটি হয়তো এই যে, তার কোনো উপাধির প্রয়োজন নেই, আর পাঁচজনের মতোই থাকবেন, এই সিদ্ধান্তটি তিনি জীবনপ্রভাতেই নিয়ে ফেলেছিলেন। অথচ তিনিই আবার নিজের নামের বানান সম্বন্ধে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন, সঠিক বানানটি কী হবে তা নিয়ে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ, প্রিন্সিপাল শেখ শরফুদ্দীন-এর মতো বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে মতামত নিয়েছেন। এ দু’য়ের ভেতর আসলে কিন্তু কোনো বিরোধ দেখি না; তার ব্যক্তিত্বে যেমন ছিল আত্মসম্ভ্রমবোধ, তেমনি ছিল সকলের সঙ্গে নিসঙ্কোচে মিশে যাবার ক্ষমতা। যে তাজউদ্দীন নিজের জামাকাপড়ের যত্ন নিতে পছন্দ করতেন, একাত্তরে তাকেই তো দেখেছি একটি মাত্র শার্ট পরে দিনের পর দিন কাটাচ্ছেন, প্রয়োজনে সেটিকে রাতে ধুয়ে পরের দিনের পরিধেয় হিসাবে উপযোগী করে নিচ্ছেন, এবং একই কামরাকে দপ্তর, শোবার ও খাবার ঘর হিসাবে ব্যবহার করছেন। আত্মসম্মানজ্ঞান এবং অহমিকাবোধ এক বস্তু নয়, একেবারেই আলাদা বটে।

চার
সংবেদনশীলতা, কর্তব্যজ্ঞান ও দায়িত্ববোধের কারণে তাজউদ্দীন আহমদের রাজনীতিতে যুক্ত থাকার অনিবার্যতাটা বোঝা গেল, কিন্তু কোন ধরনের রাজনীতি তিনি করবেন তার মীমাংসাটি কীভাবে ঘটলো, সে জিজ্ঞাসাটা তো রয়েই যায়।
শুরুতে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে ছিলেন, কিন্তু সেখানে যে থাকতে পারবেন না সেটা সাতচল্লিশের পরেই বুঝে ফেলেছেন। মুক্তি পরের কথা, পাকিস্তান স্বাধীনতাও আনেনি। কিন্তু যাবেন কোথায়? বিকল্প কোনো রাজনৈতিক সংগঠন তো গড়ে ওঠেনি। তাজউদ্দীন বড় বড় নেতাদের সবাইকেই চেনেন ও জানেন, তাদের জনসভায় তিনি যাচ্ছেন এবং বক্তৃতা শুনছেন, তার মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। সেগুলো লক্ষ করবার মতো। আটচল্লিশের ২১ মার্চ তিনি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বক্তৃতা শুনেছেন, এবং আশাহত হয়েছেন। সাতচল্লিশের পরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কয়েকবার ঢাকায় এসেছেন। তিনি ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ নাজিমুদ্দীনের বিরুদ্ধে, কিন্তু তাই বলে নিজে যে প্রগতিশীল তা বলা যাচ্ছে না। ওদিকে মওলানা ভাসানী ঢাকায় চলে এসেছেন, এবং রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। এই দুই নেতা সম্পর্কে তাজউদ্দীনের ধারণাটা দেখা যাক।
একান্ন সালের ৫ জানুয়ারি আরমানিটোলার ময়দানের এক জনসভায় সোহরাওয়ার্দী বক্তৃতা করবেন। অনেক লোক হয়েছে। তাজউদ্দীনের মনে হচ্ছে এটি ঢাকার সবচেয়ে জনাকীর্ণ সভার একটি। ময়দান পরিপূর্ণ। উপস্থিতি ৫০ হাজারের মত। কিন্তু বক্তৃতা শুনে তাজউদ্দীন যে সন্তুষ্ট হয়েছেন তা নয়। তিনি লক্ষ্য করছেন-
'[...] তার দল [অর্থাৎ আওয়ামী মুসলিম লীগ] কি নীতি অনুসরণ করবে সেটা জনাব সোহরাওয়ার্দী উল্লেখ না করে এড়িয়ে গেলেন। তার সম্পূর্ণ বক্তৃতাটিই আবেগপূর্ণ ও নির্বাচনী চমকে ভরা।'
বক্তৃতা শুনে তাজউদ্দীনের মনে হচ্ছে যে, সোহরাওয়ার্দীর একমাত্র লক্ষ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নাজিমুদ্দীনদেরকে হটিয়ে দিয়ে শাসনক্ষমতা দখল করা। তাজউদ্দীনের পক্ষে এই নেতৃত্বের প্রতি আকৃষ্ট হবার কথা নয়। তিনি তা হনও নি। ওই সভাতে মওলানা ভাসানীও ছিলেন, তিনিই সভাপতিত্ব করছিলেন।
তাজউদ্দীন তার ডায়েরিতে লিখেছেন, মওলানা ভাসানীর বক্তৃতাটির বিশেষত্ব ছিল এই রকমের-
'মওলানা ভাসানী তার স্বভাবসুলভ নির্মম অকপটতায় প্রায় ২০ মিনিটের মতো বললেন। যা তার প্রেসিডেন্টকেও (অর্থাৎ সোহরাওয়ার্দীকে) আঘাত করেছে। [...] জনাব সোহরাওয়ার্দী তার নিজের নীতির গুণকীর্তনে মুখর ছিলেন।'
বেছে নিতে হলে দু’জনের ভেতর মওলানার প্রতিই যে তিনি ঝুঁকবেন সেটা ধারণা করা যায়। এক বছর আগে ওই আরমানিটোলা ময়দানেই মওলানা ভাসানীর আরেকটি বক্তৃতা তিনি শুনেছেন। আওয়ামী মুসলিম লীগ তখন সবেমাত্র গঠিত হয়েছে, ভাসানী যার সভাপতি। সমাবেশ হিসাবে এটিও ছিল বিশাল। তাজউদ্দীনের দিনপঞ্জিতে আছে- 'সাড়ে তিনটায় সভা শুরু হয়েছে, শেষ হলো সাড়ে পাঁচটায়, পুরোটা সময় জুড়ে ভাসানী বক্তৃতা দিলেন।'
তাজউদ্দীনের অনুভূতি এরকমের-
'মওলানা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সব বিষয়ে কথা বললেন। চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করলেন। কোরিয়ার পরিস্থিতি, সেখানে আমেরিকার কৌশল, পাকিস্তানের জন্য কোন কিছু অর্জন না করেই এমন কি কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের জন্য কোনো শর্ত আরোপ ছাড়াই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে লিয়াকত আলীর যোগসাজশের কথা বললেন। কনসেমরি এবং জনাব লিয়াকত আলী সাহেবের বিরুদ্ধে তিনি অনাস্থা জ্ঞাপন করলেন। পাকিস্তানে সম্ভবত এরকম ঘটনা এটাই প্রথম। প্রধানমন্ত্রী যখন সমর্থনের জন্য পূর্ব-বাংলায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন তখন বাংলার মানুষ তার মুখের উপর তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল। সারা বছরের যে কোনো জনসমাবেশে থেকে এই সমাবেশে উপস্থিতি ছিল অনেক বেশী, প্রায় ২০/২৫ হাজার।'
দেখা যাচ্ছে ভাসানীকে তিনি পূর্ববঙ্গের মুখপাত্র হিসাবে বিবেচনা করছেন; সোহরাওয়ার্দীকে দেখেছেন ক্ষমতা লাভে আগ্রহী একজন রাজনীতিক হিসেবে। তার দৃষ্টিতে দু’জনের ভেতর পার্থক্যটা একেবারেই মৌলিক।
ভাসানীর সভার ঠিক পরের দিনই পুরানো পল্টনে লিয়াকত আলী একটি সভা করেন। সরকারি আয়োজন, উপলক্ষ কায়েদে আজমের জন্মদিবস উদ্যাপন। কাজেই জনসমাগম হয়েছে বেশ ভালো, ভাসানীর জনসভার দ্বিগুণের চেয়েও বেশী, পঞ্চাশ হাজার। কিন্তু লিয়াকত আলীর বক্তৃতা তাজউদ্দীনের ওপর সামান্যতম প্রভাবও ফেলতে পারে নি। ডায়েরিতে এইটুকু মাত্র বলা আছে : “উপস্থিত ছিলাম। জনাব লিয়াকত আলী বক্তব্য রাখলেন।” ব্যস ওইখানেই শেষ; এই বিশাল জনসভায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কী বললেন, কোন বাণী শোনালেন তার কিছুমাত্র উল্লেখ নেই। ইতিমধ্যে সোহরাওয়ার্দী তাজউদ্দীনের আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় সোহরাওয়ার্দীর অপর একটি জনসভার মূল্যায়নে। ১৯৫২ সালের নভেম্বর মাসে সোহরাওয়ার্দী পুনরায় বক্তৃতা দেন আরমানিটোলার মাঠে। এই বক্তৃতা তার কাছে এতই অকিঞ্চিৎকর ঠেকেছে যে, এর সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করার প্রয়োজন বোধ করেননি; কেবল লিখেছেন যে, সভায় বিপুল সংখ্যক লোক উপস্থিত ছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তো প্রত্যাখ্যাত হয়ে গেছেন আগেই, সোহরাওয়ার্দী যে শূন্যস্থান পূরণ করবেন তেমনটি ঘটছে না।
মওলানার প্রতি তাজউদ্দীন আকৃষ্ট হচ্ছেন, কিন্তু মওলানা তখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি এবং তাজউদ্দীনের আগ্রহ নেই সে-সংগঠনে যোগদানের। তার সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ কামরুদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল জলিল ও অলি আহাদের। তাজউদ্দীনের মতো এরাও এক সময়ে মুসলিম লীগে ছিলেন, এখন আর নেই। এদের সবার চিন্তা অসাম্প্রদায়িক ধারার রাজনীতির জন্য পথ খোঁজার। চবড়ঢ়ষবং ঋৎববফড়স খবধমঁব গঠনের কথা ভাবা হচ্ছে, বাংলায় যার নাম হবে গণ-আজাদী লীগ; কিন্তু উদ্যোগ হিসাবে সেটা তেমন জমে উঠছে না, মূল কারণ কামরুদ্দীন আহমদ সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে নেই, তিনি আইনজীবী, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সঙ্গে তার যোগ আছে, নতুন দল গড়ার ব্যাপারে তার আগ্রহ যে অত্যন্ত প্রবল, এমনটা মনে হচ্ছে না। কিন্তু তাজউদ্দীনের আগ্রহ রয়েছে। তিনি ব্রিটিশ লেবার পার্টির গঠনতন্ত্র সংগ্রহ করে সেটা পাঠ করছেন। ইসলাম, ইসলামে ধনবণ্টনের সমস্যা, গণতন্ত্র, আল্লাহর অস্তিত্ব, ধর্মতত্ত্ব, লোকে কেন কমিউনিজমের দিকে ঝুঁকছে, এসব তখনকার সময়ের প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে পরিচিতজনদের সঙ্গে সময় ও সুযোগ পেলেই আলোচনা করছেন। গণ-আজাদী লীগের জন্য ম্যানিফেস্টো লিখছেন; প্রস্তাবিত দলের জন্য একটি পাঠচক্র প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছেন, যেখানে মৌলিক চিন্তায় অভ্যস্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতির অধ্যাপকরা এসে সমাজতন্ত্র এবং উপমহাদেশের অর্থনীতির বিষয়ে ক্লাস নেবেন বলে আশা রাখছেন।
রাজনৈতিক জীবনের জন্য কিছুটা অজ্ঞাতে এবং অনেকটাই সজ্ঞানে প্রস্তুতি নিচ্ছেন যে-তাজউদ্দীন আহমদ তার ডায়েরিতে দু’টি বস্তুর বিশেষ রকমের উল্লেখ দেখি- একটি ঘড়ি, অন্যটি সাইকেল। এ দু’টি তার নিত্যসহচর। ঘড়ি দেখে ও মিলিয়ে কাজ করেন, সময়ের অপচয় করেন না, সকালে উঠে ঘড়ি দেখে জানেন পাঁচটা বাজে নাকি সাড়ে পাঁচটা, ডায়েরি লিখে ঘুমাতে যাবার আগে দেখে নেন ক’টা বাজলো, সাড়ে দশটা নাকি এগারোটা। ঘড়ি বিকল হলে অস্থির হয়ে পড়েন। আপনজনদের ঘড়ি উপহার দিতে পছন্দ করেন, গ্রামের স্কুলের জন্য ঢাকা থেকে ঘড়ি কিনে নিয়ে যান প্রথম সুযোগেই। ঘড়ির কাঁটা তার নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলাবোধের ওপর সর্বক্ষণ নজরদারি করে। আর সাইকেল তাকে দেয় চলমানতা। এটি না থাকলে তিনি অচল হয়ে পড়েন। কিন্তু সাইকেলে করে যাবেনটা কোথায়, যাবেন কত দূর? দিনলিপিগুলো পড়লে বুঝতে পারি তিনি একটি বৃত্তের ভেতর আটকা পড়ে গেছেন, যেটিকে তিনি চাননা। সাইকেলে চেপে ঘোরাফেরা তাকে সন্তুষ্টি দিচ্ছে না- তা সেটি ‘উদ্দেশ্যবিহীনই’ হোক, কিংবা হোক সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে। বৃত্তটিকে তিনি চান পারলে ভাঙতে, না-পারলে অন্তত ডিঙ্গাতে। বৃত্তটা কেবল স্থানের নয়, স্থানেরটি দৃশ্যমান, এমনকি কম পীড়াদায়ক, সমাজ ও রাজনীতি তার জন্য যে বৃত্তটা তৈরি করে রেখেছিল সেটির তুলনায়। ডায়েরির পাতাগুলো পড়লে এটা অনুভব করা যায় যে ওই গণ্ডিবদ্ধতা তার কাছে ক্রমশ দুঃসহ হয়ে উঠছে। যদিও তিনি মোটেই অস্থির নন।
গণ্ডি পার হবার প্রস্তুতিটা চলছিল। শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ, রাজনীতির অনুশীলন, সংস্কৃতিচর্চা, খেলাধুলা সব দিক দিয়েই নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন এই যুবক। দেখা যাচ্ছে ভলিবল, বাডমিন্টন, টেনিস সবকিছুই খেলছেন তিনি। অংশ নিচ্ছেন বিতর্ক প্রতিযোগিতায়, বক্তৃতা দিচ্ছেন জনসভাতে; সভাপতিত্ব করছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, যাতায়াত করছেন পাঠাগারে; আর ম্যানিফেস্টো, বিবৃতি, প্রস্তাব, কার্যবিবরণীÑ এসব লেখা, টাইপ করা, ছাপিয়ে আনা, বিতরণ করার ব্যাপারে তিনি থাকছেন সবার আগে। তার অতিশয় আপনজন ডা. করিমের সঙ্গে এক পর্যায়ে তার রাজনৈতিক বিচ্ছেদ ঘটেছে, করিম চলে গেছেন কমিউনিস্টদের সঙ্গে, তাজউদ্দীন যোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগে, তবে ১৯৬২তে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় দুজনেই কারাবন্দী হয়েছেন, এবং সৌভাগ্যক্রমে দুজনের থাকার ব্যবস্থাও হয়েছে একই সেলে। করিম জেলে ছিলেন পাঁচ মাস, আরো অনেকেই তখন জেলে; তাদের সাহচর্যে করিমের বন্দীজীবন নিরানন্দে নয়, বেশ আনন্দেই কেটেছে। তাস খেলা ছিল নিত্যদিনের বিনোদন। করিম দেখতেন তাজউদ্দীন একা একা দাবা খেলছেন, কারণ সঙ্গীদের মাঝে কেউই দাবা খেলতে জানত না। করিমের ভাষায়, “সে নিজেই নিজের প্রতিপক্ষ হয়ে একা একা কেমন করে দাবা খেলত এটা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারতাম না। প্রতিযোগিতা ছাড়া খেলা জমে? নিজের সাথে নিজের প্রতিযোগিতা এ কেমন? তাজউদ্দীনের মাঝে মাঝে নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার একটা প্রচেষ্টা হয়ত ছিল।”৫
হয় তো নয়, অবশ্যই ছিল। রাজনীতির এই কর্মী সবসময়েই চেষ্টা করতেন কীভাবে নিজেই নিজেকে অতিক্রম করে যাবেন। কারাবন্দী অবস্থায় এই দুই বন্ধুর ভেতর রাজনীতির নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। উভয়েরই আগ্রহ কৃষকের মুক্তির প্রশ্নে। করিম বলেছিলেন, ঋণসালিসী বোর্ডের মাধ্যমে ফজলুল হক কৃষককে ঋণের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছেন। শুনে তাজউদ্দীন মন্তব্য করেছেন-
'মুক্তি না ছাই করে গেছেন। কৃষকের মুখে দুধের বদলে চুষনি ঢুকিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছেন। যেখানে কৃষকরা বিদ্রোহী হয়ে উঠত তাদের অধিকার আদায়ে, আপাতত সান্ত্বনা দিয়ে কৃষকের বারটা বাজিয়েছেন।'৬
এমন উক্তিতে করিম চমকে উঠেছেন, বুঝতে পেরেছেন যে তাজউদ্দীন অন্যদের তুলনায় গভীরভাবে চিন্তা করতে অভ্যস্ত। তার লক্ষ্য সংস্কার নয়, মৌলিক পরিবর্তন। ডা. করিমের সময় সময় মনে হতো যে তাজউদ্দীন তাদের সমবয়স্ক নন, অগ্রজ।
মওলানা ভাসানীর প্রতি আকর্ষণ সত্ত্বেও তাজউদ্দীন প্রথমে আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেননি। স্মরণীয় যে, তাজউদ্দীন ছাত্র রাজনীতিতে নয়, উৎসাহী ছিলেন জাতীয় রাজনীতিতে, যদিও ফজলুল হক মুসলিম হলে যে নির্বাচন হতো তাতে প্রার্থী না হলেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন এবং একবার আক্ষরিক অর্থেই নাওয়া-খাওয়া ভুলে একটানা সাতদিন গোসল না-করে নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত ছিলেন, রাজনীতি সচেতনতার তাড়নাতে। ভাসানীর দলে যোগ না-দেওয়ার একটি কারণ হতে পারে আওয়ামী লীগের ‘মুসলিম’ পরিচয়। তিনি এবং তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বন্ধুরা সবাই তখন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কথা ভাবছেন। দ্বিতীয় কারণ, সে-সময়ে আওয়ামী মুসলিম লীগে নেতৃস্থানীয় যাঁরা ছিলেন তাদের কারো কারো আচরণে ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ প্রকাশ পাচ্ছিল বলে তার অনুভব।
পিওপল্স ফ্রিডম লীগ এগোয়নি, এরপরে ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ লীগ গঠনের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু কামরুদ্দিন আহমদ এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে চাননি, কারণ তার ধারণা হয়েছিল যে উদ্যোক্তারা প্রো-কমিউনিস্ট।৭ পরবর্তীতে, ১৯৫১ সালে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ। সংগঠনটি গঠনের সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে একটি যুব সম্মেলনের ভেতর থেকে। সরকারি বাধার কারণে এই সম্মেলন ঢাকায় হতে পারে নি; উদ্যোক্তরা তখন নদীর অপর পাড়ে জিঞ্জিরায় চলে যান, কিন্তু সেখানেও পুলিশি হস্তক্ষেপ ঘটে। তখন তারা বুড়িগঙ্গায় চারটি নৌকায় বসে সম্মেলন করেন। কাকতালীয় অবশ্যই, তবু মিলটা বোধ করি তাৎপর্যহীন নয় যে চীনে কমিউনিস্টদের কার্যক্রমের শুরুর দিকে সাংহাই নগরীতে গোপন বৈঠক করবার সময় পুলিশ তাদের আস্তানাটি ঘিরে ফেলতে যাচ্ছে টের পেয়ে মাও সে তুং-ও তার সহকর্মীদের নিয়ে বের হয়ে গিয়ে নৌকাতে বৈঠকের কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। তারা অবশ্য এর পরে আর শহরে ফেরেননি, যুবলীগের সদস্যদের পক্ষে না-ফিরে উপায় ছিল না।
যুবলীগে অলি আহাদ, তোয়াহা, তাজউদ্দীন- সবাই ছিলেন। বায়ান্নর আন্দোলনে সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এটি রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে ওঠেনি। না-ওঠার একাধিক কারণ ছিল। সংগঠন ও কর্মীদের সবাই ছিলেন তরুণ, সফল নেতৃত্ব দিতে পারেন এমন কেউ ছিলেন না, তদুপরি তাদের ভেতর মতাদর্শিক ঐক্যের বন্ধনটা যে দৃঢ় ছিল, তা-ও নয়। অপরদিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী মুসলিম লীগ দৃশ্যমান ও শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। যুবলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন অলি আহাদ, তিনি লিখেছেন-
'১৯৫১ সালে কারামুক্তির পর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক দেশবাসীকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করিবার নিমিত্ত সমগ্র দেশব্যাপী অবিরাম কর্মিসভা, জনসভা ইত্যাদি করিয়া যাইতেছিলেন। মুসলিম লীগ ও মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন কোথাও ১৪৪ ধারা জারি করিয়া আবার কোথাও গুণ্ডামীর আশ্রয় গ্রহণ করিয়া আওয়ামী মুসলিম লীগের কর্মসূচি পালনে সর্বপ্রকার ব্যাঘাত সৃষ্টি করিতে থাকে। কিন্তু জনতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে অবিচল আস্থা স্থাপন করিয়া ক্রমশঃ আওয়ামী মুসলিম লীগের পতাকাতলে কাতারবন্দী হইতে শুরু করে।'৯
অবশেষে ১৯৫৩ সালে তাজউদ্দীন আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দিলেন। একই সময়ে অলি আহাদও যোগ দিয়েছেন। তাজউদ্দীন ওই বছরই ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। পরের বছর তিনি যুক্ত ফ্রন্টের মনোনয়ন পেয়ে ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হলেন। কয়েক মাস পরে ৯২-ক ধারা জারি হলে গ্রেফতার হন; বেরিয়ে এসে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও সমাজসেবা সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। ১৯৫৮তে সামরিক শাসন জারি হলে আবার তাকে জেলে যেতে হয়; এবং পরের বছর মুক্তি পান। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পরে ১৯৬৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনে তাজউদ্দীনের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য; তিনি দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরের বছর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারাভিযানে অংশ নেন। ১৯৬৬তে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলের যে সম্মেলনে শেখ মুজিব ৬ দফার ঘোষণা দেন তাতে তাজউদ্দীন উপস্থিত ছিলেন। ৬-দফার রচনায় অনেকেই যুক্ত ছিলেন; তবে এর চূড়ান্ত রূপটি তাজউদ্দীনই দেন। ওই বছরই তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। এর পরে তিনি গ্রেফতার হন, মুক্তি পান ১৯৬৯-এ, এবং রাওয়ালপিন্ডির গোলটেবিলে অংশ নেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তারপর অসহযোগ আন্দোলন এবং একাত্তরের গণহত্যা। তাজউদ্দীন আহমদের তখনকার ভূমিকা আমাদের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল।
প্রশ্ন থাকে, কেন তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিলেন। তার সহযাত্রী মোহাম্মদ তোয়াহা যোগ দিলেন কমিউনিস্ট পার্টিতে, তাজউদ্দীন কেন দিলেন না? কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ না-দেওয়ার অন্তত তিনটি কারণ আমরা দেখতে পাই। প্রথম কারণ সম্বন্ধে তিনি নিজেই বলেছেন, সেটি হলো আবুল হাশিমের প্রভাব। তার ভাষায়, “আবুল হাশিম সাহেব যদি বেঙ্গল মুসলিম লীগের সেক্রেটারি না থাকতেন, আবুল হাশিম সাহেবের কাজ, ফিলসফি, মিশন যদি আমাদের সামনে না থাকত, তাহলে আমরা সবাই কমিউনিস্ট হয়ে যেতাম।”৯ দ্বিতীয় কারণ, কমিউনিস্ট পার্টি তখন দৃশ্যমান ছিল না। পার্টি নিষিদ্ধ হয় ১৯৫৪তে, কিন্তু ১৯৪৭-এর পর থেকেই পার্টির সদস্যদের ওপর নিপীড়ন শুরু হয়েছে, নেতাদের সবাইকেই থাকতে হয়েছে হয় কারাগারে নয়তো আত্মগোপনে। একটি হিসাব বলছে, অবিভক্ত বঙ্গে পার্টির ৩০ হাজার সদস্যের মধ্যে শতকরা ৫ জন ছিলেন মুসলমান, বাকি সবাই হিন্দু; দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ হিন্দু সদস্যই পশ্চিমবঙ্গে চলে গিয়েছিলেন।১০ পার্টির অফিসে নিয়মিত হামলা হতো, সভা করলে মুসলিম লীগের গুণ্ডারা ভাঙচুর করতো। ঢাকার রথখোলার মোড়ে পার্টির একটি বইয়ের দোকান ছিল, একদিন পুলিশ এসে সমস্ত বই গাড়িতে করে নিয়ে যায়, যে-লোকটি বই বিক্রি করছিল তাকেও গ্রেফতার করে। এক কথায় ওই পার্টির সঙ্গে যুক্ত হওয়াটা মোটেই সহজসাধ্য ছিল না।
তৃতীয় কারণটিই অবশ্য প্রধান। সেটি হলো তাজউদ্দীন আহমদের নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি। শুরু থেকেই তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভেতরেই ছিলেন। জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে দক্ষিণপন্থীদের সংখ্যাধিক্য ছিল এটা ঠিক, কিন্তু একটি বামপন্থী ধারাও ছিল; তাজউদ্দীনের অবস্থান ওই বামপন্থী ধারাতে। এই বামপন্থীরা ছিলেন একই সঙ্গে উপনিবেশবাদবিরোধী ও সামন্তবাদবিরোধী; কিন্তু সমাজতন্ত্রী নন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তাজউদ্দীনরা দেখছিলেন ব্রিটিশ চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু সে জায়গায় অবাঙালি ধনীদের শাসন কায়েম হয়েছে। অন্যদিকে সামন্তবাদের অবসান মোটেই ঘটে নি। দরিদ্র কৃষক আগের মতোই জমিদার, জোতদার, মহাজন ও আমলাদের দ্বারা শোষিত ও নিপীড়িত হচ্ছে। পশ্চাৎপদতা ও অজ্ঞতার কারণে মানুষের মনোজগত ছিল অত্যন্ত সঙ্কুচিত। যাতায়াতব্যবস্থা অকিঞ্চিতকর। প্রায় সব গ্রামেই মেয়েদের জন্য পড়াশোনার কোনো সুযোগ ছিল না। আমলা, রাজনীতির লোক ও ব্যবসায়ীরা কখনো একত্রে, কখনো বা নিজ নিজ পদ্ধতিতে অসহায় মানুষকে পীড়ন করতো। তাজউদ্দীন রাজনীতিতে এসেছিলেন, এবং ছিলেন রাষ্ট্র ও সমাজে পরিবর্তন আনার আকাক্সক্ষা নিয়ে। পরিবর্তন আনার কাজে যুক্ত হবার যে-পথটা তিনি খোলা দেখেছেন সেটি হলো ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য হওয়া। ব্যক্তিগত ক্ষমতা লাভ নয়, সমাজের প্রয়োজনে নিপীড়নকারী ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ইচ্ছাই ছিল চালিকাশক্তি।
নিজের এলাকার মানুষের অভাব অভিযোগ তুলে ধরবেন, প্রতিকারের ব্যবস্থা করবেন এবং বিদ্যমান রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক চরিত্রে পরিবর্তন এনে তাকে গণতান্ত্রিক করে তুলতে সচেষ্ট হবেন, এই আশাকে তিনি লালন করতেন। তাজউদ্দীন যে নির্বাচনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন এ খবর তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জানতো। তার এলাকা থেকে সরকার দলীয় পরিষদ সদস্য ছিলেন প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ফকির আবদুল মান্নান। তাজউদ্দীনের দিনলিপিতে আভাস আছে, তাকে নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরিয়ে রাখার জন্য মান্নান সাহেব বিভিন্ন কৌশলের কথা ভাবছেন। তার বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা দেওয়ার চিন্তা যে করা হয়নি তা-ও নয়।
তাজউদ্দীনের চেষ্টা ছিল রক্ষণশীলতার গণ্ডিটা ডিঙ্গিয়ে বেরিয়ে যাবেন। একা যাওয়া সম্ভব নয়; অনেককে লাগবে; সে জন্য মুসলিম লীগকে বাদ দিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করা যায় কি না, সে-চেষ্টা করলেন। দেখলেন পারা যাচ্ছে না। ওদিকে নির্বাচনে এগিয়ে আসছে; আওয়ামী মুসলিম লীগ মুসলিম লীগের একমাত্র প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাসানী, যার প্রতি তিনি ইতিমধ্যে আস্থাবান হয়ে উঠেছেন। তাছাড়া এই দল যে তাদের নাম থেকে ‘মুসলিম’ পরিচয়পত্রটি অবলুপ্ত করবে এমন প্রতিশ্র“তিও দলের কার্যক্রমের ভেতরেই দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। এবং সেটা কার্যকরও হয়েছে বৈকি, নির্বাচনের পরের বছরই আওয়ামী লীগ তার ‘মুসলিম’ত্বটি পরিত্যাগ করেছে।
তাজউদ্দীন আহমদ আত্মজীবনী লেখার সময় ও সুযোগ পান নি, রাজনীতি বিষয়ে বই লিখবেন এমন অবকাশও তার ছিল না, তার জীবন মাত্র পঞ্চাশ বছরের, কিন্তু তার রাজনৈতিক কার্যক্রম ও দিনলিপি অনুসরণ করলে আমরা দেখব যে তিনি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য লড়ছিলেন। রাজনীতির পরিভাষায় এটিকে বলা যাবে বুর্জোয়া গণতন্ত্র। এর প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে যথার্থ সংসদীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং রাষ্ট্র ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য ছিল। ধারণা করি তিনি ভাবতেন যে, একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব দরকার ছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য পথ পরিষ্কার করার প্রয়োজনেই। দ্বিতীয়টিই লক্ষ্য, প্রথমটি উপায় বটে। তাছাড়া এটাও তো সত্য যে, তখনকার বাস্তবতায় জাতিগত নিপীড়নের বিষয়টির মীমাংসা না-ঘটালে শ্রেণীগত নিপীড়নের বিষয়টিকে পরিষ্কারভাবে সামনে আনা যাচ্ছিল না।
সবকিছু মিলিয়ে এটাই স্বাভাবিক ছিল যে, তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রগতিশীল ধারার সঙ্গেই যুক্ত হবেন, কমিউনিস্ট পার্টিতে না গিয়ে। মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে ব্যক্তি তাজউদ্দীন নিজেকে গণতান্ত্রিক মানুষ হিসাবে গড়ে তুলছিলেন। গণতান্ত্রিকতার জন্য অনেক উপাদান আবশ্যক; অপরিহার্য দু’টির একটি হলো পরমতসহিষ্ণুতা ও জবাবদিহিতা। এ দু’টি গুণের জন্য জাতীয়তাবাদীরা বিখ্যাত নন; তাদের ভেতর প্রবণতা থাকে একনায়কতন্ত্রের। জাতীয়তাবাদী তাজউদ্দীন কিন্তু সচেষ্ট ছিলেন গণতান্ত্রিক হবার জন্য। আমরা দেখি যে তিনি আলাপ আলোচনা ও বিতর্কে অত্যন্ত উৎসাহী। আর তিনি যে প্রত্যহ দিনান্তে সযত্নে দিনলিপি তৈরি করতেন ওইখানে দেখা যায় যে নিজেই নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন, হিসাব নিচ্ছেন দিনটা কীভাবে কাটিয়েছেন। কোথায় অপচয় অবহেলা ঘটলো, সার্থকতার জায়গাটা কোনখানে।
গণতান্ত্রিকতার আরেকটি শর্ত হচ্ছে সামন্তবাদী সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা। সেই চেষ্টা তার মধ্যে নিরন্তর। দেখতে পাচ্ছি তিনি উপন্যাস পড়ছেন শরৎচন্দ্রের, নাটক পড়ছেন শেকস্পীয়রের; খবর রাখছেন বিশ্বের কোথায় কী ঘটছে সে-সবের। একান্ন সালের মে মাসের একটি দিনের ডায়েরিতে ফজলুল হক হলের একটি অনুষ্ঠান সম্পর্কে লিখেছেন, “এই প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের অনুষ্ঠানে ছাত্রীরা অংশগ্রহণ করল। খুরশিদী খানম দু’টো গান গাইলেন। দমবন্ধ করা অনুষ্ঠানের মধ্যে এই এটি ছিল সফল একটি আয়োজন।” ইংরেজি বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা কার্জন হলে ওথেলো নাটকের মঞ্চায়ন করছে; তাজউদ্দীন সেটি উপভোগ করছেন। লিটন হলে চিত্রকলার প্রদর্শনী হয়েছে, দর্শক হিসাবে সেখানে তিনি রয়েছেন। যুবলীগের উদ্যোগে বার লাইব্রেরি হলে তিনি রবীন্দ্র জয়ন্তীর আয়োজন করছেন। একান্ন সালের ডায়েরিতে লিখে রাখছেন এই সংবাদ যে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কৃত্রিমভাবে ইকবাল দিবস প্রতিপালিত হচ্ছে। এর বিপরীতে জনগণের বিরাট অংশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের জন্মদিন পালন করছে।
খবর পাওয়া গেছে এমনকি প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও নতুন লক্ষ্যে দিবস দু’টিতে অংশগ্রহণ করেছে। জনগণের স্বাভাবিক জাগরণ!
তার ইংরেজি ভাষার চর্চা নিজের ভেতরকার বুর্জোয়া বিকাশেরই অংশ। কিন্তু বুঝতে কোনো অসুবিধা নেই যে, তিনি মোটেই উৎপাটিত নন, সৃষ্টিশীল ও গভীর ভাবে প্রোথিত। দেখতে পাচ্ছি গ্রামে গিয়ে তিনি মুর্শিদী ও জারি গান শুনছেন। বিলে নেমে অন্যদের সঙ্গে মাছ ধরছেন। কর্মরত মানুষজনের সাথে আত্মীয়ের মতো আলাপ করছেন।
যেমনটা প্রত্যাশিত ছিল, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তাজউদ্দীন যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে প্রার্থী হয়েছেন। পরিস্থিতিটা অবশ্যই উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। কিন্তু তাজউদ্দীনের ভেতর তার কোনো ছাপ নেই। ডায়েরি পড়ে জানা যাচ্ছে যে, তার নির্বাচনী সভায় মুসলিম লীগের লোকরা আক্রমণ করছে, সভা পণ্ড হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তিনি অস্থিরতা প্রদর্শন করছেন না। বিচলিত না হয়ে সাইকেলে করে জনসংযোগ করে চলেছেন। মার্চ মাসের ১০ তারিখে ভোট গ্রহণ হয়েছে, ১৩ তারিখের ডায়েরির পাতায় বি: দ্র: দিয়ে নোট রাখছেন যে, ওই দিনই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ল’ ক্লাস শুরু করলেন। তারপর প্রতিদিন সন্ধ্যায় ক্লাশ করছেন। ১৮ তারিখ একটি বিশেষ দিন; সেদিন ভোট গণনা হয়েছে। তাজউদ্দীন জিতেছেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঠিক তিনগুণ নয়, তার চেয়েও বেশী ভোটে পরাজিত করে দিয়েছেন। ঢাকায় তাকে নিয়ে মিছিল বের হয়েছে। কিন্তু বিজয়ের কারণে তিনি যে আবেগে আপ্লুত, এমন কোনো লক্ষণ নেই তার ডায়েরিতে। কয়েকদিন পরে তাকে দেখতে পাই তিনি এই জন্য খুশি হয়েছেন যে তার এলাকায় বৃষ্টিপাত হয়েছে। লিখছেন, “এই মৌসুমের জন্য এটি শুভলক্ষণ। এই বৃষ্টি বোরো ধান ও আউষ চাষের জন্য খুব ভালো হবে। জমি বেশ ভিজেছে। কড়া রোদ আর অনাবৃষ্টিতে সারা দেশ কুঁকড়ে উঠেছিল। জলবসন্ত ছড়িয়ে পড়ছিল।” ২৯ এপ্রিলের দিনলিপিতে দেখছি চালের দাম নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন; পঞ্চাশ সালে যে মন্বন্তর হয়েছিল তার কথা তার স্মৃতিতে। বলছেন, “কিছুদিন ধরে শহরে ন্যায্যমূল্যের দোকান চালু হওয়ায় তা শহরের মানুষের জন্য স্বস্তির কারণ হয়েছে। কিন্তু গ্রামের মানুষ আগের মতোই ভুক্তভোগী।”
নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, এখন কী কী সুযোগ সুবিধা নেওয়া যায় তা নিয়ে কোনো সুচিন্তা ডায়েরির কোথাও নেই। যে-কারণে তিনি রাজনীতিতে এসেছেন ঠিক সে-কারণই তার রাজনীতি ভিন্ন চরিত্র গ্রহণ করেছে।
পাঁচ
শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাজউদ্দীন আহমদের মাঝে যে সম্পর্কটি স্থাপিত সেটি তাদের উভয়ের জন্য তো বটেই, আমাদের সমষ্টিগত ইতিহাসের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা অনিবার্য ছিল যে তারা একসাথে কাজ করবেন, এবং কাজের সময়ে ও ভেতর দিয়ে একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠবেন। দু’জনের মধ্যে বয়সের দূরত্ব ছিল পাঁচ বছরের, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবধান ছিল উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্র সচিব এস. এ করিম তার লেখা Sheikh Mujib, Triumph and Tragedy বইতে এই ব্যবধানের কথা বলতে গিয়ে দেখিয়েছেন যে মুজিব ছিলেন অতুলনীয় বক্তা এবং সাধারণ মানুষের মনের ভাব ও ইচ্ছাকে সরল ভাষায় তুলে ধরে তাদের আস্থা ও ভালোবাসা জয় করে নেবার ব্যাপারে তার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। তিনি তার দলকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। অন্যদিকে তাজউদ্দীনের ছিল তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং সুশৃঙ্খল মন; তিনি যে খুব ভালো বক্তা ছিলেন তা নয়, কিন্তু আলাপ-আলোচনার বেলায় ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। তার কর্তব্যবোধ ছিল দৃঢ় দুর্দান্ত।১১
দু’জনের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পার্থক্য ছিল। ডা. করিম ছিলেন উভয়েরই বন্ধু; ১৯৬২ সালে তারা একসঙ্গে জেলে ছিলেন; তখন তিনি দেখেছেন যে পূর্ববঙ্গকে যে স্বাধীন করতে হবে এ-বিষয়ে উভয়ের ভেতর ঐকমত্য ছিল, কিন্তু কোন পথে এগুতে হবে, তা নিয়ে বিস্তর তর্কবিতর্ক হতো। মন কষাকষির ঘটনা যে ঘটতো না তা-ও নয়। একদিনের কথা তার বিশেষভাবে মনে আছে। সেদিন তারা সবাই মিলে ভলিবল খেলছিলেন। একদিকের দলপতি শেখ মুজিব, অন্যদিকের দলপতি তাজউদ্দীন। হঠাৎ একটি পয়েন্ট নিয়ে দু’দলের ভেতর বচসা বেধে যায়; রেফারি ছিলেন মানিক মিয়া, তিনি রায় দিলেন পয়েন্ট কেউ পাবে না। খেলা নতুন করে শুরু হলো। মুজিবের দল জিতল, করিম লিখছেন, “মুজিব বললেন, ‘দেখলে ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’। তাজউদ্দীন টিপ্পনী কেটে বললো, ‘হ্যাঁ যে-দিকে বাতাস সে-দিকে নড়ে’।” তাজউদ্দীনের ওই মন্তব্যে দু’জনের ভেতর ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়, এবং কয়েকদিন কথাবার্তা বন্ধ থাকে।১২ করিমের ধারণা শেখ মুজিব মনে করেছিলেন যে, তাজউদ্দীন ধর্মকে তাচ্ছিল্য করেছেন। কিন্তু তিনি নিশ্চিত যে তাজউদ্দীন তা করেন নি।
১৯৬২তে আন্দোলন ছিল না; নেতারা সবাই বন্দী ছিলেন; স্রোতহীনতার ওই সময়ে ভুলবোঝাবুঝিটা অস্বাভাবিক ছিল না; কিন্তু ১৯৬৪তে যখন রাজনৈতিক তৎপরতার একটি প্রবাহ তৈরি হলো তখন দেখি শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীন এক হয়ে গেছেন; মুজিব আছেন সামনে, নেতা তিনিই; কিন্তু সবাই বুঝতে পারছেন যে, তাজউদ্দীন আছেন সঙ্গেই, পরিপূরক হিসাবে। ছয় দফার ঘোষণা দেবার পর জুলফিকার আলী ভুট্টো মুজিবকে বিতর্কে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। মুজিব সে-চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। ভুট্টো তার উপদেষ্টাদের নিয়ে ঢাকায় এলে তাজউদ্দীন তার সঙ্গে দেখা করেন, বিতর্কের আনুষ্ঠানিকতা ঠিক করার জন্য। তার সাথে কথা বলে ভুট্টো বুঝেছেন বিতর্কের জন্য এপক্ষ থেকে যে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে তাতে তিনি সুবিধা করতে পারবেন না। তর্কযুদ্ধে না নেমে ভুট্টো সদলবলে প্রস্থান করেন।১৩
সাতই মার্চের সেই ঐতিহাসিক বক্তৃতাটি বঙ্গবন্ধুরই; কিন্তু তার পেছনেও তাজউদ্দীন ছিলেন; কোন কোন পয়েন্টে বলতে হবে তা তিনিই সাজিয়ে দিয়েছেন; এবং মঞ্চে বসে সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন কোনোটি যেন অঘোষিত না থাকে। এর পরে শুরু হয় অসহযোগ, তখন বাংলাদেশের সরকার চলতো আওয়ামী লীগের নির্দেশে। পঁয়ত্রিশটি নির্দেশ জারি করা হয়েছিল, সেগুলো তাজউদ্দীনের হাতেই রচিত। দেশের কাছে মুজিব তখন অদ্বিতীয়, আর তাজউদ্দীন অদ্বিতীয় মুজিবের কাছে।
চরম মুহূর্তটি এসেছিল পঁচিশে মার্চের রাত্রে। পাকিস্তানি হানাদারেরা কী করবে টের পাওয়া যাচ্ছিল, কিন্তু আন্দোলনের নেতারা কী করবেন সেটা ছিল অনিশ্চিত। এখন জানা যাচ্ছে যে, পরিকল্পনা ছিল আত্মগোপন করে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হবে, এবং অনিবার্য যুদ্ধে মুজিব ও তাজউদ্দীন একসঙ্গে থাকবেন। তদানুযায়ী তাজউদ্দীন গেলেন বঙ্গবন্ধুর কাছে; গিয়ে শোনেন তিনি ঠিক করেছেন বাড়িতেই থাকবেন, তাজউদ্দীনদের সঙ্গে যাবেন না। দেশের ইতিহাস তখন তাকিয়ে ছিল সিদ্ধান্তের দিকে, সিদ্ধান্ত এলো না। তাজউদ্দীন একটি লিখিত বিবৃতি নিয়ে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরের জন্য, একটি টেপ রেকর্ডারও তার সঙ্গে ছিল, নেতার কণ্ঠস্বরে দিকনির্দেশ রেকর্ড করবেন এই আশায়। স্বাক্ষর পেলেন না, কণ্ঠস্বরও পেলেন না। হানাদার বাহিনী যে হত্যাকাণ্ড শুরু করবে তার সব লক্ষণ তখন স্পষ্ট, খবরও আসছে নানা সূত্রে। মোকাবিলা করতে হলে নেতাকে চাই, বঙ্গবন্ধু তখন জাতির অবিসংবাদিত নেতা, তাকে বাদ দিয়ে যুদ্ধ চলবে কী করে? তাছাড়া তার অনুপস্থিতিতে কার পরে কে থাকবেন সেই ক্রমটি যেহেতু তিনি জানিয়ে দেন নি, তাই নেতৃত্বের কেবল যে অভাব ঘটবে তা নয়, যারা থাকবেন তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেবে, কেউ কাউকে মানতে চাইবেন না, ফলে সঙ্কটের সৃষ্টি হবে। এসব যুক্তি তাজউদ্দীন দিয়েছেন। কিন্তু নেতা অনড় ছিলেন তার সিদ্ধান্তে।
হতাশা ও অভিমানে তাজউদ্দীন নিজের বাড়িতে ফিরে কিছুক্ষণ বিছানাতেই শুয়ে ছিলেন। কিন্তু সেভাবে তো থাকা সম্ভব নয়; উঠে পড়েছেন, বাড়ির সামনের লনে পায়চারি করছেন। ওদিকে সময় সঙ্কুচিত হয়ে আসছিল; যে-ঘড়ির কাঁটা ধরে তিনি সব সময়ে চলতেন সেটি এগুচ্ছিল। যে-মানুষটি সব সময়েই দ্রুত ও সবার আগে সিদ্ধান্ত নিতেন এবং যার সিদ্ধান্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে, ইতিহাসের ওই বিশেষ মুহূর্তটিতে, এবং জীবনে প্রথম বারের মতো, তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ কেবল অপ্রস্তুত নয়, একেবারেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় দেখতে পেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত কী ঘটতো আমরা জানি না, যদি না তরুণ রাজনীতিক ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম প্রায় জোর করে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যেতেন।
এর অল্পক্ষণ পরেই হানাদারেরা এসে পড়েছিল। তাদের হাতে পড়লে তিনি হয়তো নিহত হতেন। কারণ গণহত্যার স্থানীয় পরিকল্পনাকারীদের শীর্ষে ছিলেন যে সেনাপতি সেই রাও ফরমান আলী তাজউদ্দীনকে বিশেষভাবে অপছন্দ করতেন। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুকে আটক করা ও জীবিত রাখা দুটোই তাদের জন্য জরুরি ছিল; তাজউদ্দীনের ক্ষেত্রে জীবিত রাখার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। শত্র“ নির্ণয়ের ব্যাপারে বিশেষ মহলের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় একাত্তরে আরো দেখা গেছে, যেমন পাকিস্তানপন্থী গোলাম আযম মনে করতেন শেখ মুজিবের চেয়েও বড় দুশমন হচ্ছেন মওলানা ভাসানী; এবং জাতীয়তাবাদী মুজিববাহিনী ভাবতো তাদের প্রধান শত্র“ পাকিস্তানিরা নয়, প্রধান শত্র“ বামপন্থীরা। জহুরীরা যদি জহরই না চিনবে তবে তো তাদের পরিচয় বৃথা। তাজউদ্দীন না থাকলে ঘটনা কোন দিকে গড়াতো আমরা জানি না, তবে এটুকু জানি যে, মানুষের মধ্যে দিগভ্রান্তি ও হতাশা দুটোই বাড়তো এবং শত্র“পক্ষের গণহত্যা ও নারী নির্যাতন কাজটা আরো নৃশংস ও বীভৎস আকার ধারণ করতো। হানাদাররা তো বলতোই যে, তারা মানুষ চায় না, মাটির দখল চায়।
বাড়ি থেকে বেরিয়েই কিন্তু তাজউদ্দীন সমস্ত দ্বিধা ত্যাগ করে অবিলম্বে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তার জানা হয়ে গেছে যে, অন্য কোনো উপায় নেই, যুদ্ধে যাওয়া ছাড়া। কিন্তু যুদ্ধটা কেমন হবে, কীভাবে লড়তে হবে, মিত্র হিসাবে কাদের পাওয়া যাবে, যোদ্ধা ও অস্ত্র কে সরবরাহ করবে সেসব একেবারেই জানা ছিল না। মুক্তির জন্য এত বড় একটি জনগোষ্ঠীর এমন প্রস্তুতিহীন যুদ্ধ ইতিহাসে বিরল।
শুরুতে তাজউদ্দীন মনে হয় ধারণা করতে পারেননি শত্র“টি কেমন ভয়ঙ্কর ও সুসজ্জিত। নইলে তিনি কেন অমন ব্যস্ত হবেন চটের থলিতে-রাখা রাইফেলটির খোঁজে, যেটিকে পরে কোথায় ফেলবেন সেটাই এক সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছিল। কেবল তিনি নন, আরো অনেকেই যুদ্ধক্ষেত্রে প্রয়োজন হবে মনে করে নিজেদের সংগৃহীত অকিঞ্চিতকর হাতিয়ার নিয়ে রওনা হয়ে দেখেছেন হাতিয়ার বরঞ্চ বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনপন্থী কমিউনিস্ট বলে পরিচিত মোহাম্মদ তোয়াহা ও বদরুদ্দীন উমর বের হয়ে পড়েছিলেন অনিশ্চিত যাত্রায়, তাদের সঙ্গে কিছু অস্ত্রশস্ত্র ছিল; সেগুলো নিয়ে বিশেষভাবে বিপদে পড়েছিলেন। কোথায় ফেলবেন কীভাবে ফেলবেন সে এক মহাসমস্যা। তাদের সঙ্গে ছিল দু’জন কিশোর, তারাও রওনা হয়েছে যুদ্ধে যাবে বলে, কিন্তু তারা বিপদে পড়েছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনার দরুন ভালো বাংলা বলতে পারে না বলে। গ্রামের লোকদের সন্দেহ হয়েছে এরা বিহারী, অতিউৎসাহীরা কিছু লোক ঠিক করেছিল তাদেরকে হত্যা করে পাঞ্জাবিদের বাঙালি নিধনের প্রতিশোধ নেবে। অনেক কষ্টে কিশোর দু’টিকে তাৎক্ষণিকভাবে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। একই ধরনের বিপদে পড়েছিলেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান ও অধ্যাপক আনিসুর রহমান। তারাও রওনা হয়েছিলেন যুদ্ধে যাবার জন্য, কিন্তু ভাষা ও উচ্চারণের সমস্যার দরুণ অবাঙালি বলে চিহ্নিত হয়েছিলেন। বাঁচা অসম্ভব হতো ঢাকা কলেজের অধ্যাপক মোহাম্মদ নোমান যদি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না হতেন। তিনি তখন পাশের গ্রামে ছিলেন।
তাজউদ্দীনের জন্য অবশ্য এ ধরনের কোনো সমস্যা ছিল না। অস্ত্র ফেলে দিয়ে তিনি বের হয়েছিলেন লুঙ্গি ও ফতুয়া পরে, বাজারের থলিও ছিল হাতে। তবে তার জন্য ছদ্মবেশ ছিল অপ্রয়োজনীয়, কেননা চতুর্দিকের প্রায় সবমানুষই তখন আওয়ামী লীগের সমর্থক। আওয়ামী লীগের নেতা এবং কর্মীরাও ছিলেন প্রায় সর্বত্র। তবু বিঘ্ন ছিল বৈকি। অজানা বিপদ যেকোনো দিক থেকে আক্রমণ করত পারতো। শরণার্থীরা সবাই তখন সীমান্তমুখী, আমীর-উল- ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে তাজউদ্দীনও যাচ্ছিলেন সেদিকেই। কিন্তু স্রোতের প্রবাহে নয়, স্বতন্ত্রভাবে।
ব্যারিকেড সৃষ্টি করে শহরে প্রতিরোধের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু কোনো কাজে লাগেনি। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির বর্তমান সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তখন ছাত্রনেতা। সম্ভাব্য সেনা আক্রমণের হাত থেকে ঢাকা শহরকে রক্ষা করার ব্যাপারে তারা যেসব উপায়ের কথা তখন ভেবেছিলেন সেগুলোর মধ্যে ছিল বিভিন্ন বাড়ির ছাদের ওপরে গরম ভাতের মাড়, মরিচের গুঁড়া ইত্যাদি রাখা, যাতে সেনাবাহিনী মার্চ করলে তাদের ওপর সেসব নিক্ষেপ করে তাদেরকে রুখে দেয়া যাওয়া। তিনি মন্তব্য করেছেন, “একটি আধুনিক সেনাবাহিনীর বিপরীতে এমন ছেলেমানুষি প্রস্তুতি এখন হাস্যকর মনে হতে পারে, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে যে আবেগ ছিল তার বলিষ্ঠ প্রমাণ পাওয়া।”১৫ সেটা সত্য। আবেগের কোনো অভাব ছিল না, অভাব ছিল প্রস্তুতির, এমন কি সঠিক ধারণারও।
মওলানা ভাসানী কিন্তু জানতেন কী করতে হবে। ১৯৫৭ সাল থেকেই তিনি স্বাধীনতার কথা প্রকাশ্যে বলে আসছেন। একাত্তরেও তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, পাকিস্তানি সেনাপতিদের সঙ্গে আলোচনায় কোনো ফল হবে না, তারা বেঈমানী করবে। তার সে-ধারণা পুরোপুরি সত্য প্রমাণিত হয়েছে। পাকিস্তানি সেনাপতিরা যে কেবল বিশ্বাসঘাতকতাই করেছে তা নয়, আলোচনাকে আবরণ হিসাবে ব্যবহার করে গণহত্যার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। পঁচিশে মার্চের পরে মওলানা ভাসানী গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন, ৬ এপ্রিল যখন হানাদারেরা সে-বাড়িতে আক্রমণ চালাল তখন তিনি একবস্ত্রে বেরিয়ে গেছেন এবং যমুনা নদী দিয়ে নৌকায় ভাসতে ভাসতে আসামে গিয়ে উঠেছেন। হয়তো আশা ছিল ভারত থেকে বের হয়ে লন্ডনে যাবেন, এবং সেখানে একটি প্রবাসী বিপ্লবী সরকার গঠন করে যুদ্ধ পরিচালনা করবেন। সেটা যে সম্ভব নয় তা ভারতের মাটিতে পা দিয়েই বুঝে ফেলেছেন। বাকি সময়টা তিনি অন্তরীণেই কাটিয়েছেন, কিন্তু নিজের অবস্থা নিয়ে একদিনের জন্যও কোনো আপত্তি তোলেননি, বরঞ্চ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করার জন্য।
ভাসানীকে ভারতে পেয়ে তাজউদ্দীন নিশ্চয়ই খুশি হয়েছিলেন। একপর্যায়ে অস্থায়ী সরকারের জন্য যখন একটি সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রয়োজন দেখা দেয় তখন মওলানাকেই তার সভাপতি করা হয়, এবং তিনি বিনা দ্বিধায় সে-পদ গ্রহণ করেন। ওই পরিষদের সভা অবশ্য একবারই বসেছিল; তাজউদ্দীন সন্তুষ্ট হতেন সভা যদি আরো হতো এবং পরিষদকে যদি স্থায়ীরূপ দেওয়া যেতো। যুদ্ধটাকে শুধু আওয়ামী লীগের না-রেখে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের রূপদানে তিনি আগ্রহী ছিলেন। ওই আগ্রহ থেকেই উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু পরিষদকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা কোনো মতেই সম্ভব ছিল না। প্রবল আপত্তি ছিল আওয়ামী লীগের ভেতর থেকেই। ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে, আওয়ামী লীগের নেতারা কেউই প্রত্যক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলেন না, তাদের অধিকাংশই থাকতেন হয় কলকাতায় নয়তো আগরতলায়। তাদের ভেতর দলাদলি ছিল, কিন্তু ঐক্য ছিল এক জায়গায়, সেটা হলো যুদ্ধ থেকে বামপন্থীদেরকে দূরে রাখা। যুদ্ধের সম্ভাব্য সুফলের সবটুকুর ওপরই তাদের চোখ ছিল। মুক্তিবাহিনীতে বামপন্থী তরুণদেরকে না-নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এ ব্যাপারে সবচেয়ে উগ্র ছিলেন মুজিববাহিনীর যুবনেতারা।
এই বাহিনী যুদ্ধ করে নি। কাইউম খান নামে একছাত্র যুদ্ধে গিয়েছিলেন, স্বেচ্ছায়। যুদ্ধকালীন তিনি বাংলাদেশের নিয়মিত সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণের জন্য মনোনীত হন, এবং প্রশিক্ষণ শেষে আবার যুদ্ধক্ষেত্রে চলে আসেন। তিনি তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, মুজিববাহিনী কোথাও কোনো যুদ্ধে অংশ নিয়েছে এমন একটি দৃষ্টান্তও কেউ দিতে পারবে না। এই যোদ্ধাটি টের পেয়েছেন যে, মুজিববাহিনী একটি গোপন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল, সেটি হলো বামপন্থীদের হত্যা করার।১৬ মুজিববাহিনী ছিল তাজউদ্দীনের অজান্তে ভারতীয় গোয়েন্দাবাহিনীর দ্বারা গঠিত একটি এলিট ফোর্স, যেখানে বামপন্থীদের তো বটেই, কোনো কৃষক-সন্তানেরও প্রবেশাধিকার ছিল না। অপরদিকে মুক্তিবাহিনীর অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন কৃষক পরিবারের সদস্য।
মুজিববাহিনীর সঙ্গে খোন্দকার মোশতাক আহমদের কোনো প্রকার মিল থাকার কথা নয়। মোশতাক সবসময়েই ছিলেন মুজিববিরোধী, তার বিপরীতে মুজিববাহিনীর নেতারা দাবি করতেন যে তারা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী এবং তার ইচ্ছার ধারক। কিন্তু পরস্পরবিরোধী দুইপক্ষ এক হয়েছিল তাজউদ্দীন-বিরোধিতার ক্ষেত্রে। উভয়পক্ষই মনে করতো সরকারের সর্বময় কর্তৃত্ব তাদের হাতেই থাকা উচিত। অবশ্য এটাও তো সত্য যে এরা সবাই ছিলেন দক্ষিণপন্থী; মোশতাকের বামবিরোধিতা শুরু হয়েছিল তার রাজনৈতিক জীবনের যখন সূত্রপাত তখন থেকেই, তেমনিভাবে মুজিববাহিনীর সূচনাও বামবিরোধিতার ভেতর থেকেই। তাজউদ্দীনকে এরা উত্ত্যক্ত করেছেন। মোশতাককে তবু পররাষ্ট্র দফতরের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে কিছুটা হলেও কাবু করতে পেয়েছিলেন, কিন্তু মুজিববাহিনীকে তিনি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি; বাহিনীটি মুক্তিবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হোক, এমন প্রস্তাব তিনি দিয়েছেন; কিন্তু সেটি গৃহীত হয় নি। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ হয়তো ভাবছিলেন যে, সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখাটা ঠিক হবে না।
কিন্তু যুদ্ধকালে তাজউদ্দীনের তো কোনো বিকল্প ছিল না। তার তুলনায় মেধাবী, দক্ষ, কর্তব্যজ্ঞান ও দায়িত্ববোধসম্পন্ন দ্বিতীয় কেউ ওই সময়ে ছিলেন না। তার প্রতি সমর্থনও ছিল ব্যাপক। তার জন্য ঝুঁকি ছিল নানা প্রকারের। ব্যর্থ হতে পারেন এমন আশঙ্কা তো সর্বক্ষণই থাকার কথা। পাকিস্তানের চরেরাও নিশ্চয়ই অনুপস্থিত ছিল না। মুজিববাহিনীর তৎপরতার বিষয়েও তাকে সতর্ক থাকতে হতো। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের সঙ্গে সঙ্গেই যে তিনি ঢাকায়-চলে আসেন নি, এক সপ্তাহের মতো সময় নিয়েছিলেন, তার কারণ ঢাকায় তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সময় লাগছিল; বলাবাহুল্য ভয়টা তখন পাকিস্তানিদেরকে নয়, তারা তো তখন পলায়নতৎপর, ভয়টা ছিল মুজিববাহিনীর সদস্যদেরকে জড়িয়েই।
যুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের চোখে তিনি ছিলেন এক নম্বর শত্র“। যুদ্ধশেষেও তাকে শত্র“ হিসাবে দেখবার লোক রয়েই গেল।
একাত্তরে সরদার ফজলুল করিম গ্রেফতার হন; তার কমিউনিস্ট পরিচয়টি পাকিস্তানি গোয়েন্দারা ভোলে নি। সেই সময়ে সামরিক বাহিনীর লোকেরা তাজউদ্দীনকে কোন দৃষ্টিতে দেখতো তার প্রমাণ তিনি তাদের হাতে বন্দী অবস্থাতে পেয়েছিলেন। তিনি স্মরণ করেছেন-
'মেজর এসে বলল, ‘ইউ পিওপল, দি বাস্টার্ড সানস অব তাজউদ্দীন’, তাজউদ্দেিনর নামটা তারা নিল, অন্য কারো নাম না। তাজউদ্দীন সাইলেন্টলি কাজ করত। [...] যা ফাইল ওয়ার্ক ছিল করত। তার কোনো বক্তৃতাবাজি ছিল না। আমাকে যেটা স্ট্রাইক করল সেটা হচ্ছে মেজর বেটা আমাকে গালি দিতে গিয়ে তাজউদ্দীনের নামটা উল্লেখ করল।'১৭
বামপন্থীদের তথাকথিত উগ্র যে-ধারাটিকে মুজিববাহিনী তাদের বিশেষ লক্ষ্যবস্তু হিসাবে চিহ্নিত করেছিল সেটিতে তখন অনেকগুলো গ্রুপ। প্রথম দিকে কোনো কোনো গ্র“পের দ্বিধা ও সংশয় থাকলেও পরে কিন্তু সকল গ্র“পই যুদ্ধে অংশ নেয়। তবে লড়াইয়ের কাজটা তাদের জন্য মোটেই সহজ ছিল না। প্রথমত তারা লড়ছিলেন দেশের মাটিতে থেকেই, যে-কাজটা ছিল খুবই বিপজ্জনক, কারণ তাদের অস্ত্র সরবরাহ ছিল অত্যন্ত সীমিত, এবং পিছু হটে যে ভারতে আশ্রয় নেবেন সেটা ছিল বিবেচনার বাইরে। দ্বিতীয়ত, যদিও তাদের লড়াইটা ছিল পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের বিরুদ্ধেই, তবু প্রথম থেকেই তারা আওয়ামী লীগের স্থানীয় সদস্য এবং পরে ভারতপ্রত্যাগত প্রশিক্ষিত মুক্তিবাহিনী ও মুজিববাহিনী উভয়ের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের সে-ইতিহাস লিপিবদ্ধ হবার অপেক্ষায় রয়েছে।
ছয়
৩০ মার্চ বিকেলে তাজউদ্দীন যখন সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন যখন তিনি শরণার্থী ছিলেন না, ছিলেন মুক্তিসংগ্রামী বাংলাদেশের প্রধান মুখপাত্র। ভারতের পক্ষ থেকে সেভাবেই তাকে গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে তিনি বিষণœ বোধ করছিলেন।১৮ তার কারণ কেবল এটা নয় যে তিনি অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়াচ্ছেন, কারণ এটাও যে জাতীয়তাবাদী একটি বিশ্বাসকে চূড়ান্তভাবে পরিত্যাগ করে আরেকটি বিশ্বাসের ভূমিতে পা রাখছিলেন। কিশোর বয়সে তিনি পাকিস্তানে বিশ্বাস করতেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশও নিয়েছেন; সে-রাষ্ট্রের ভিত্তিতে ছিল যে-জাতীয়তাবাদ তাকেই সত্য বলে জানতেন। সেই অবস্থান থেকে অবশ্য তিনি সরে আসা শুরু করেছিলেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে থেকেই। একাত্তরে এসে ধর্মভিত্তিক ওই জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যান করে নতুন এক জাতীয়তাবাদের জগতে পৌঁছে গেছেন, সেটি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। একের মৃত্যুতে অপরের জন্ম; একদা যে আপনজন ছিল তার মৃত্যুর ঘটনা বিচ্ছেদের বোধ তৈরি করবে এটা অস্বাভাবিক নয়; সেটা সেদিন তার বিষণ্নতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল।
নতুন জাতীয়তাবাদ সামাজিকভাবে ইহজাগতিক, রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মনিরপেক্ষ। সে সত্যটা প্রকাশ পেয়েছিল অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এপ্রিলের ১০ তারিখে যে বেতারভাষণটি তিনি দেন তার মধ্যে। আগের জাতীয়তাবাদে হিন্দু-মুসলিম বিরোধ প্রতিফলিত ছিল, নতুন জাতীয়তাবাদে সংগ্রামটা হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সকলের; এর প্রতিপক্ষ হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী পাকিস্তানি রাষ্ট্র। সে জন্য ভাষণটিতে তিনি বলেছিলেন, “এক মুহূর্তের জন্যও ভুললে চলবে না যে, এ যুদ্ধ গণযুদ্ধ [...] এ যুদ্ধ বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের যুদ্ধ।” আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, রক্ত আর ঘামে ভেজা বাংলাদেশের মাটিতে গড়ে উঠবে নতুন এক গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা।১৯ ২৭ তারিখ সকালে তাজউদ্দীন যখন ঢাকা ত্যাগ করেন তখন তার বেশভূষা ছিল মধ্যবিত্তের; থলি হাতে মাথায় টুপি চাপিয়ে যিনি বাজারে বের হয়েছেন। সীমান্ত অতিক্রমের সময় তার মুখে ছিল খোঁচা খোঁচা দাড়ি, বেশভূষা কৃষকের। ওটি ছিল ভারত যদি সমর্থন না-দেয় তাহলে আত্মগোপন করে দেশের ভেতরে থেকেই যুদ্ধ চালাবার প্রস্তুতির অংশ। গণযুদ্ধ যে মূলত কৃষকের যুদ্ধই হবে, এ-নিয়ে তার মনে কোনো সংশয় দেখা দেয় নি। কৃষক প্রশ্নে মওলানা ভাসানী এবং তাজউদ্দীন তখন এককাতারে ।
ভারতের কাছ থেকে কোন ধরনের সাহায্য চান সেটাও তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাতকারেই; যেটি ঘটে দিল্লিতে, এপ্রিলের ৩ তারিখে। তিনি বলেছিলেন, “এটা আমাদের যুদ্ধ। আমরা চাই ভারত এটাতে জড়াবে না। আমরা চাই না ভারত তার সৈন্য দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে আমাদের স্বাধীন করে দিক।”২০ ১০ এপ্রিলের বক্তৃতাতেও ওই একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত। তাতে বলা হয়েছিল, “বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের কাছে যে অস্ত্রসাহায্য আমরা চাইছি তা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে একটি স্বাধীন দেশের মানুষ হিসাবে আর একটি স্বাধীন দেশের মানুষের জন্য। এই সাহায্য আমরা চাইছি শর্তহীনভাবে এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি তাদের শুভেচ্ছা ও সহানুভূতির প্রতীক হিসেবে, হানাদারদের রুখে দাঁড়াবার এবং আত্মরক্ষার অধিকার হিসেবে যে অধিকার মানবজাতির শাশ্বত অধিকার...।” বাংলাদেশের ভেতরকার মানুষসহ প্রায় সবাই যখন বলাবলি করছিল ভারত কেন অতিদ্রুত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে আমাদেরকে উদ্ধার করার ব্যবস্থা করছে না, তাজউদ্দীন তখন সতর্ক ছিলেন যুদ্ধটা যাতে কিছুতেই ভারত-পাকিস্তানের চিরকালের বিবাদের নতুন বহির্প্রকাশ হিসাবে চিহ্নিত না হয়, পাকিস্তানের জন্য যেটা ঈপ্সিত ছিল। এও তার দূরদর্শিতার প্রতিফলন।
যুদ্ধে শেখ মুজিব উপস্থিত ছিলেন না এটা সত্য, কিন্তু তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণার সার্বক্ষণিক উৎস। অস্থায়ী বাংলাদেশের সরকারেরও তিনিই ছিলেন প্রধান। তাজউদ্দীন তার ১০ এপ্রিলের বক্তৃতা করেছিলেন যে বাক্যটি দিয়ে সেটি হলো, “বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মুক্তি-পাগল গণ-মানুষের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সরকারের পক্ষ থেকে আমি আপনাদেরকে আমার সংগ্রামী অভিনন্দন জানাচ্ছি।” পঁচিশের রাত্রের পর দুই নেতা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন, সেই বিচ্ছিন্নতা যাতে স্থায়ী দূরত্বের রূপ নেয় সে লক্ষ্যে একদিকে মোশতাক ও তার অনুসারীরা এবং অন্যদিকে মুজিববাহিনীর নেতারা অত্যন্ত তৎপর ছিলেন। মুজিবনগরে অবস্থানকালে তাজউদ্দীনের সতর্কতার জন্য তারা সফল হননি।
কিন্তু দূরত্বটা তৈরি হওয়া শুরু করলো ১০ জানুয়ারি তারিখে শেখ মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। এ ব্যাপারে মোশতাকের চেষ্টার চাইতে অধিকতর ফলপ্রসূ হয়েছিল মুজিববাহিনীর চার নেতার কূটকৌশল। তারা প্রথম সুযোগেই শেখ মুজিবের কান ভারী করেছেন। এস এ করিমের ইংরেজি বইটিতে যে-বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে তা এরকম : মুজিবের প্রত্যাবর্তনের পরের দিন খুব সকালে তাজউদ্দীন গেছেন তার নেতার সঙ্গে দেখা করতে। গিয়ে দেখেন মুজিব তার দিকে ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কথা তাজউদ্দীনই শুরু করেন, তিনি বলেন, “আমি আশা করেছিলাম যে, ওই কঠিন সময়ে বিরূপ পরিবেশে স্বাধীনতার সংগ্রাম কীভাবে পরিচালনা করেছিলাম সে-বিষয়ে আপনি জানতে চাইবেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে আপনি সেটা শুনতে আগ্রহী নন। কিন্তু দেশের স্বার্থে আপনার সঙ্গে একটি বিষয়ে আলাপ করা দরকার। সেটি হলো এই যে, মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র রয়ে গেছে। সেগুলো জমা দিতে আমি অনুরোধ করেছিলাম। তারা শোনে নি।” সব শুনে মুজিব নাকি বলেছিলেন, “ওনিয়ে দুশ্চিন্তা করো না। আমার ছেলেরা অস্ত্র রেখেছে। আমি বললে সেগুলো তারা দিয়ে দেবে।” তাজউদ্দীন তখন বুঝে ফেলেছেন যে তিনি তার নেতার আস্থা হারিয়েছেন।২১ তার সে-ধারণা সত্য প্রমাণিত হয়েছে যখন তাকে প্রথমে প্রধানমন্ত্রিত্ব ও পরে মন্ত্রিসভার সদস্যপদও ছেড়ে দিতে হয়।
তাজউদ্দীনের অনুপস্থিতে চার যুবনেতা মুজিবকে কী কী বুঝিয়েছিলেন সে-সম্পর্কে একটি ধারণাও বইটিতে দেওয়া হয়েছে। তারা বলেছেন তাজউদ্দীন ক্ষমতালোভী, সে জন্যই তিনি কারো সঙ্গে পরামর্শ না-করেই নিজেই নিজেকে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ঘোষণা করে দিয়েছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অমান্য করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যুবনেতাদেরকে তাদের কর্তব্য পালনের ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছেন। আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করবেন কী, তাজউদ্দীন নেতাদেরকে বিভক্ত রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। তাজউদ্দীনের উচ্চাভিলাষ খুব বেশি, এবং তিনি চেষ্টা করবেন মুজিবকে প্রেসিডেন্টের পদে বসিয়ে সব ক্ষমতা নিজে কুক্ষিগত করতে। কাজেই তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া দরকার। তাজউদ্দীন নেতাকে-প্রদত্ত তাদের এসব বক্তব্য ও পরামর্শের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানতেন না। তবে তিনি আশা করছিলেন যে বঙ্গবন্ধু হয়তো শীঘ্রই তার ভুল বুঝতে পারবেন। সেটা যখন ঘটলো না তখন তার একজন হিতাকাক্সক্ষীকে তিনি বলেছিলেন, “স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই আমি যদি মারা যেতাম তা হলে সেটাই বরঞ্চ ভালো ছিল।”২২
এস. এ করিম মুজিবের সঙ্গে জিন্নাহর একটি তুলনামূলক চিত্র দিয়েছেন। তিনি দেখাচ্ছেন এঁরা দু’জনেই ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু দু’জনের মধ্যে পার্থক্য ছিল এখানে যে-জিন্নাহ সব ক্ষমতা নিজের হাতে ধরে রাখতে চাননি, মুজিব যেটা চেয়েছিলেন; ফলে ভীতিজনক দায়িত্বের এক বোঝা বহন করতে গিয়ে তিনি সঙ্কটে পড়েছিলেন, এবং দেখতে পাচ্ছিলেন যে, সব কাজেই তার ব্যক্তিগত মনোযোগের দরকার পড়ছে।২১
কিন্তু কেবল যে অন্যদের কুমন্ত্রণাই বঙ্গবন্ধু এবং তার প্রধান অনুসারীর ভেতর ব্যবধান সৃষ্টির একমাত্র কারণ, তা বোধ হয় নয়। রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে দু’জনের দৃষ্টিভঙ্গির ভেতরও পার্থক্য ছিল। প্রাথমিক ভাবে চারটি ব্যাপারে তা প্রকাশ পেয়েছিল। ১. যুদ্ধাপরাধীদের বিচার; ২. মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নিয়ে একটি জাতীয় মিলিশিয়া তৈরি’র প্রস্তাব; ৩. বিশ্বব্যাংকের সাহায্য গ্রহণ; এবং ৪. বাকশাল গঠন।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে তাজউদ্দীনের সুস্পষ্ট আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে পাকিস্তানি হানাদারদের বিচার করা কঠিন হবে, তাই আপাতত তাদের দেশীয় দোসরদেরকেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। এক্ষেত্রে তার চিন্তাধারাটি অনুসরণ করা দুঃসাধ্য নয়। তিনি ভাবছিলেন যে অতবড় অপরাধ করে কারো পক্ষেই পার পেয়ে যাওয়া উচিত নয়। প্রতিহিংসাপরায়ণতা নয়, ন্যায়বিচারের স্বার্থেই তাই দালালদের বিচার করাটা জরুরি। ওই রকম ভয়ঙ্কর মাত্রায় অপরাধে যারা অভিযুক্ত তাদের যদি শাস্তি না হয় তাহলে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি দেশবাসীর আস্থাটাই দুর্বল হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত এটাও হয়তো তার ধারণার মধ্যে ছিল যে, রাষ্ট্রের প্রকৃত শত্র“রা যদি চিহ্নিত না হয় তাহলে তারা পুনর্বাসিত হয়ে যাবে এবং শত্র“ খুঁজতে গিয়ে রাষ্ট্রের চোখ বামপন্থীদের ওপরই গিয়ে পড়বে। মূলত তার আগ্রহেই ‘বাংলাদেশ দালাল আদেশ ১৯৭২’ প্রবর্তিত হয়েছিল। তাই ১৯৭৩ সালে যখন তার সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন, তাজউদ্দীন তখন হতাশ হয়েছিলেন। তার মনে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে এর ফলে হানাদারদের অনুচরেরা শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ১৯৭৪ সাল থেকেই তিনি তার স্ত্রীকে বলতে শুরু করেছিলেন, “তুমি বিধবা হতে চলেছ। মুজিব ভাই বাঁচবেন না, আমরাও কেউ বাঁচব না। দেশ চলে যাবে স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে।”২৪
মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নিয়ে একটি জাতীয় মিলিশিয়া গঠনের উদ্যোগটিও ছিল তাজউদ্দীনের নিজের চিন্তা-প্রসূত। এসম্পর্কে একটি সরকারি ঘোষণাও প্রকাশিত হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল যে, অর্থনীতির পুনর্গঠন ও স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার দুরূহ কর্তব্য সম্পাদনের লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এ বাহিনীটি গঠিত হবে। কিন্তু ওই ঘোষণাটি কার্যকর করা হয় নি, তার বিপরীতে রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়েছিল, যার অধিকাংশ সদস্যই এসেছিলেন মুজিববাহিনীর ধারাপ্রবাহ থেকে।২৫ পরবর্তীতে দেখা গেছে যে মুজিববাহিনীর মতোই রক্ষীবাহিনীরও প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল বামপন্থীদেরকে নির্মূল করা। এতে করে আলবদর রাজাকারদের সুবিধা হয়েছে, তারা দমফেলার এবং ক্রমান্বয়ে পুনর্বাসিত ও সুসংগঠিত হবার সুযোগ পেয়ে গেছে।
ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ঋণ নেওয়ার ব্যাপারে তাজউদ্দীন একেবারেই উৎসাহী ছিলেন না। প্রথম দিকে তিনি এমন ঘোষণাও দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশ আমেরিকার কাছ থেকে কোনো সাহায্য নেবে না। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক সম্পর্কে তার অনাগ্রহের একাধিক কারণ ছিল বলে আমরা ধারণা করতে পারি। প্রথমত ওয়ার্ল্ড ব্যাংক মানেই আমেরিকা; ১৯৭২ সালে ওই ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রবার্ট ম্যাকনামারা, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসাবে ভিয়েতনামের যুদ্ধের স্থপতিদের যিনি ছিলেন পুরোধা; তাজউদ্দীনের পক্ষে তাই ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা ম্যাকনামারা অনুরাগী হবার কারণ ছিল না। অনাগ্রহের মূলে সম্ভবত অন্য দু’টি কারণও ছিল। একটি হলো একাত্তরের যুদ্ধে আমেরিকার শত্র“তা। অপরটি বাংলাদেশ কারো তাঁবেদার হবে না, নিজের পায়ে দাঁড়াবে, তাজউদ্দীনের এই ঘোষিত নীতি; যাকে স্বপ্নও বলা চলে।
ম্যাকনামারা ঢাকায় আসেন ১৯৭২-এর ফেব্রুয়ারিতে। উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সদস্যকরণ এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা করা। তাজউদ্দীনের কাছে এই দুই প্রস্তাবের কোনোটিই গ্রহণযোগ্য মনে হয় নি। তিনি তখন অর্থ ও পরিকল্পনা দপ্তরের মন্ত্রী; অতিথির সঙ্গে বৈঠক একটা করতে হয় বলেই তিনি করেছেন; কিন্তু বাংলাদেশের জন্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংক কী কী করতে পারে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি যা বলেছিলেন তা কেবল তার পক্ষেই বলা সম্ভব ছিল। বৈঠকে পরিকল্পনা কমিশনের উপ-প্রধান প্রফেসর নূরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। নূরুল ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী ম্যাকনামারাকে তাজউদ্দীন জানিয়েছিলেন, যে তার দেশের জন্য এই মুহূর্তে প্রয়োজন হলো ষাঁড়ের। প্রফেসার ইসলামের ভাষায়-
He solemnly went on to explain that during the war the bullocks were either killed or dispersed all over the country as farmers fled from the marauding Pakistani army. Cattlesheds and ropes were destroyed in the process. Therefore, there was also a need for sheds and ropes.
একথা বলে তাজউদ্দীন যোগ করেছিলেন এই মন্তব্য যে, এ ধরনের প্রয়োজন পূরণ করা যেহেতু ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কর্মধারার আওতায় আসবে না ওই ব্যাংকের পক্ষে তাই বাংলাদেশকে সহায়তা দান সম্ভব হবে না।২৬ তাজউদ্দীনের বক্তব্যে কৌতুক হয়তো ছিল, কিন্তু দেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে গরু ও ষাঁড়ের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি যে বিশেষভাবেই অবহিত ছিলেন এ খবর কিন্তু তার ডায়েরিতেও পাই।
তার মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে তাজউদ্দীনের গুরুতর মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল বাকশাল গঠনের প্রশ্নে। এ নিয়ে দু’জনের ভেতর কথা হয়, এবং তাজউদ্দীন একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম যে কিছুতেই উচিত হবে না সে-কথা খুব জোর দিয়ে বলেছেন। তার চূড়ান্ত বক্তব্যটি ছিল এই রকম : “মুজিব ভাই, এই জন্যই কি আমরা ২৪ বছর সংগ্রাম করেছিলাম? যে ভাবে দেশ চলছে, আপনিও থাকবেন না, আমরাও থাকব না। দেশ চলে যাবে আলবদর রাজাকারের হাতে।”২৭ বাকশাল যখন গঠিত হয় তাজউদ্দীন অবশ্য তখন আর মন্ত্রিসভায় নেই; তবু তাকে নতুন দলের সাধারণ সম্পাদক হতে বলা হয়েছিল। প্রস্তাবটি নিয়ে গিয়েছিলেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর। তাজউদ্দীন তাকে বলেছিলেন, “বঙ্গবন্ধুকে হাজার সালাম। কিন্তু দাদা, আমি আর সহমরণের পার্টিতে যাবে না।” বাকশাল প্রসঙ্গে ন্যাপের মোজাফ্ফর আহমদকেও তিনি বলেছিলেন, “আপনারাও সহমরণের পার্টিতে যোগ দিয়েছেন।” তার রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির স্বচ্ছতা এক্ষেত্রেও প্রকাশ পেয়েছে।২৮
বাকশাল গঠনের আগে আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টির ও ন্যাপ (মোজাফ্ফর) নিয়ে যে ত্রিদলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয় তার ব্যাপারেও তাজউদ্দীনের আপত্তি ছিল। ওই ঐক্যকে ত্রিশূল আখ্যা দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিংকে তিনি বলেছিলেন, “মণি দা, আপনারা ত্রিদলীয় ঐক্যজোট করেন নি, ত্রিশূল করেছেন। এক শূলে মুজিব ভাই মারা যাবেন, অপর শূলে আপনারা ও আমরা।”২৯ ইতিহাস সাক্ষী, তার এই ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণিত হয় নি। আওয়ামী লীগের দু’জন নেতাই নিহত হয়েছেন, এবং কমিউনিস্ট পার্টি বিলোপবাদীদের আক্রমণসহ একাধিক রাজনৈতিক বিপদের মুখোমুখি হয়েছে।
ইতিহাস আরো বলবে যে, ত্রিদলীয় ঐক্যাজোট বাকশালের পূর্বাভাস এবং ওই পথ ধরে এগুনোটা যে কেবল সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য তা নয়, গোটা দেশের জন্যই অকল্যাণকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। স্বাধীনতার পরে খুব বেশি দরকার ছিল একটি কার্যকর বিরোধী দলের, যে দল সরকারের ত্র“টিগুলো ধরিয়ে দিতে পারবে, এবং একই সঙ্গে জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে বিকল্প রাজনৈতিক ধারার প্রতিশ্র“তি দেবে। মুক্তিযুদ্ধের ভেতর লালিত সমষ্টিগত মুক্তির স্বপ্ন বাস্তবায়নে জাতীয়তাবাদী আওয়ামী লীগ যে সমর্থ হবে না, সেটা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার পরেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, মানুষ তাই অপেক্ষা করছিল সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসীদের এগিয়ে আসার জন্য। সমাজতন্ত্রীদের ভেতর উগ্র বামপন্থী বলে কথিতরা তখন বিক্ষিপ্ত এবং সরকারি বেসরকারি নিপীড়নে বিধ্বস্ত। কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপই তখন বামপন্থীদের একমাত্র দৃশ্যমান ও প্রধান ধারা; তাদের পক্ষেই সম্ভব ছিল বিকল্প হিসাবে উপস্থিত হওয়া। কিন্তু সেটা না-করে তারা যখন সরকারি দলের সঙ্গে ঐক্য গড়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তখন স্বভাবতঃই একটি শূন্যতার সৃষ্টি হলো।
প্রকৃতিতে যেমন রাজনীতিতেও তেমনি, শূন্যতা সৃষ্টি হলেই অঘটন ঘটে। সেটা ঘটলো। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বেরিয়ে এসে খালি জায়গাটা দখল করে নিল। এই দলের নেতারা এক সময়ে মুজিব বাহিনীরই নেতা ছিলেন, কেবল নেতা নয় সংগঠকও। তারা মোটেই সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন না, ছিলেন ঘোরতর দক্ষিণপন্থী, বামবিরোধী এবং পুঁজিবাদে বিশ্বাসী। আওয়ামী লীগের বলয় থেকে তারা যে বেরিয়ে এসেছিলেন তার পেছনে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব ছিল না। ছিল স্বার্থের বিরোধ। জনগণ অপেক্ষা করছিল বামপন্থী আওয়াজের, এরা সেই আওয়াজটাই তুললেন; সমাজতন্ত্র তো বটেই, অঙ্গীকার করলেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। সমাজতন্ত্রীদের কাছ থেকে শুধু নেতৃত্ব নয়, রণধ্বনিগুলোও ছিনতাই হয়ে গেল। হাজার হাজার তরুণ তাদের পতাকাতলে সমবেত হলো। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য বড় রকমের ক্ষতি ঘটে গেল। জনকাক্সিক্ষত সামাজিক বিপ্লবের বাস্তবায়নের পথটা সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়ল; এবং বহু তরুণ, বিপ্লবের স্বপ্নে তাড়িত হয় যারা যেকোনো আত্মত্যাগে প্রস্তুত ছিল, তারা বিপথগামী হলো এবং রক্ষীবাহিনীসহ অন্যান্য সরকারি ও সরকারসমর্থক প্রতিপক্ষের হাতে প্রাণ দিল। দুই দশজন নয়, শত শত। সবকিছু মিলিয়ে বামপন্থী নেতাদের ব্যর্থতার দরুন বাম আন্দোলনের পক্ষে সংগঠিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ল।
জাতীয় মুক্তির আকাক্সক্ষাতেই যুদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু আঞ্চলিক শোষণের অবসানের পরে শ্রেণী শোষণের অবসান যে মানুষ চাইবে সেটা তো ছিল খুবই স্বাভাবিক। জনমুক্তির এই স্বপ্নের কথা তাজউদ্দীন জানতেন, যে জন্য ঐ যুদ্ধসময়ে তার প্রথম ভাষণেই যুদ্ধটিকে গণযুদ্ধ বলে অভিহিত করেছিলেন। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছাড়া যে শোষণমুক্তি সম্ভব নয়, এ বিষয়ে তার অস্পষ্টতা ছিল না। স্বাধীনতার পরে ঢাকার সচিবালয় প্রাঙ্গণে সরকারি কর্মচারীদেরকে উদ্দেশ্য করে প্রদত্ত তার বক্তৃতায় এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। তার বক্তব্যের মধ্যে এই কথাটা ছিল যে, “শহীদের রক্তে উর্বর মাটিতে উৎপন্ন ফসল ভোগ করবে চাষি, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ। কোনো শোষক, জালেম ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বাংলাদেশকে শোষণ করতে পারবে না।” সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকা সম্পর্কে তার যে কথাটি বলার ছিল তা হলো, তারা যেন এই সত্যটাকে ভুলে না যান যে, বিপ্লব সম্পূর্ণ করার জন্য প্রয়োজন হবে ‘সাম্যাবাদী অর্থনীতি, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ কায়েম করা।’৩০ প্রথম দিকে ওই তিন লক্ষ্যের বাস্তবায়নই ছিল রাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্য। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর রেসকোর্সে দেওয়া বক্তৃতাতে বঙ্গবন্ধুও গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথাই বলেছিলেন।৩১
রাষ্ট্রীয় মূলনীতির তালিকায় জাতীয়তাবাদের সংযোজন ঘটে পরে, সংবিধান রচনার সময়ে। সংযোজনটি তাৎপর্যহীন নয়। ধারণা করা সম্ভব যে, অন্য তিনটি নীতির বাস্তবায়ন যেহেতু সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের বাস্তববাদিতায় তাই এই উপলব্ধিটি ধরা পড়েছিল যে জাতীয়তাবাদী অর্জনটা জনগণের কাছে তুলে ধরলে আপাত জনসন্তুষ্টির কারণ ঘটবে। জাতীয়তাবাদকে অন্তর্ভুক্ত করার দরুন অবশ্য সমস্যাও তৈরি হয়েছে। একটি শুরুতেই দেখা দিয়েছিল, সেটি হলো ক্ষুদ্র জাতি সত্তাসমূহের অস্তিত্বের অস্বীকৃতি; পরে ঘটলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী তত্ত্বের উদ্ভব।
সবকিছু মিলিয়ে এটা নিশ্চিত যে, রাষ্ট্র জনগণের ঈপ্সিত মুক্তির দিকে এগোয় নি, বরঞ্চ উন্নতির পুরাতন ধারণাতেই আটকে থেকেছে। এগুতে না-পারাটা পিছিয়ে যাওয়ারই প্রমাণ। আর ওই পিছিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াতেই একের পর এক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার মধ্যে প্রধান দু’টি হচ্ছে প্রথমে বঙ্গবন্ধুর এবং পরে তাজউদ্দীনের হত্যাকাণ্ড। এমনটি যে ঘটবে তা ছিল দুঃস্বপ্নেরও অতীত।
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড তাজউদ্দীনকে শোকে অভিভূত ও বিমূঢ় করে। তিনি জানতেন যে তার জন্যও বিপদ আসবে। বিপদ আসতে যে বিলম্ব ঘটেছিল তা-ও নয়। শোনা যায় ঘাতকেরা তাকে রাষ্ট্রপতি বানাতে চেয়েছিল এবং সে-জন্য একপ্রকার মানসিক চাপও প্রয়োগ করতে থাকে। বিষয়টি সম্পর্কে তার বন্ধু ডা. করিম অবহিত ছিরেন।৩১ ব্যর্থ ও নিরাশ হয়ে তাজউদ্দীনকে ঘাতকেরা জেলখানায় নিয়ে যায়। সেটাই ছিল তার শেষ যাত্রা। যে-আশঙ্কা তার মনে ছায়াপাত করেছিল, সেটি অত্যন্ত ভয়াবহরূপে সত্য বলে প্রমাণিত হয়ে গেল।
করিম লিখেছেন, “মুজিব মন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কৃত তাজউদ্দীনকে আমি বহুবার বলেছি, দেশ ছেড়ে চলে যেতে, কিন্তু তাজউদ্দীন রাজি হয়নি। বলেছি অন্তত ভারতে যাও, সে-কথাতেও কান দেয়নি। বলত দেশের পরিবর্তন হবে, কৃষক শ্রমিক ক্ষমতা পাবে, আর সেই যুদ্ধে আমি না থাকলে কেমন হয়?”৩২
সাত
একটা যুদ্ধ শেষ করে তাজউদ্দীন আহমদ কি নতুন আরেকটা যুদ্ধের কথা ভাবছিলেন? বোধ হয় না; কেননা দ্বিতীয় যুদ্ধ তার কাছে ছিল প্রথম যুদ্ধেরই পরবর্তী পর্যায়। মুক্তির। যুদ্ধের জাতীয়তাবাদী স্তরটি শেষ হয়েছে, এখন সেটিকে নিয়ে যেতে হবে সমাজতান্ত্রিক স্তরে- ওটাই মনে হয় তার উপলব্ধি। অসময়ে চলে গেছেন, কিন্তু বেঁচে থাকলে নতুন স্তরের আন্দোলনে তিনি কী নেতৃত্ব দিতে পারতেন? হয়তো না। কেননা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি অতিদ্রুত বদলে গেছে। পুঁজিবাদের অন্তর্ঘাত ও স্বৈরাচার আগের চেয়ে প্রবল হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসনে নিষ্ঠুরতা ও বিস্তৃতি কোনোটাই কমেনি, বিস্তৃতি বরঞ্চ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে এমনকি বুর্জোয়া ধরনের গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। নামে বেনামে প্রতিক্রিয়াশীলরা দুর্দমনীয় হয়ে উঠেছে। অপরদিকে তাজউদ্দীনের নিজের প্রস্তুতি ছিল সংসদীয় রাজনীতির জন্য, সেখান থেকে বের হয়ে এসে বৈপ্লবিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া কতটা সম্ভব হতো সে-নিয়ে সংশয় থাকা স্বাভাবিক। তবে এটা ঠিক যে তেমন কোনো আন্দোলন গড়ে উঠলে তিনি অবশ্যই তাতে যোগ দিতেন, যেমন যোগ দিয়েছিলেন একাত্তরে, এবং মেধা, সংবেদনশীলতা, কর্তব্যজ্ঞান ও দায়িত্ববোধের অন্তর্গত তাগিদে সামনে চলে আসতেন।
আমরা তো দেখেছি একাত্তরে তিনি কী করণীয় তা কত দ্রুততায় স্থির করে ফেলেছেন। একবারও পেছনে ফিরে তাকান নি। ভারতে তিনি শরণার্থী হিসাবে যেতে চান নি, গেছেন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে, এবং সে-ভাবে না-যাওয়া হতে পারে অমন সম্ভাবনার মুখোমুখি হয়ে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন আত্মগোপন করে দেশের ভেতর থেকেই গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করবার। কোনো পরাভবই মানেন নি।
উপদেশের চেয়ে দৃষ্টান্ত ভালো, এটা আমরা জানি; বাগ্মী এডমন্ড বার্ক এমনও মনে করতেন যে, ব্যক্তির জন্য দৃষ্টান্তই হচ্ছে যথার্থ বিদ্যালয়, ওটি থাকলে অন্য কোনো বিদ্যালয়ের দরকার পড়ে না। দৃষ্টান্ত এখন সর্বত্রই বিদ্যমান এবং সহজলভ্য। কিন্তু ভালো দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে না, খারাপগুলো জ্বলজ্বল করে। তাজউদ্দীন একটি অত্যন্ত ভালো দৃষ্টান্ত- অনুসরণের জন্য, অনুপ্রাণিত হবার প্রয়োজনে।
তাজউদ্দীন রাজনীতি করতেন, ব্যক্তিগত মুনাফার জন্য নয়, সমাজ-পরিবর্তনের লক্ষ্যে। সে-রাজনীতি এখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে, আর সে-জন্যই রাজনীতিক তাজউদ্দীনের দৃষ্টান্তের আরো অধিক গুরুত্ব। একজন রাজনৈতিক মানুষের ব্যক্তিত্ব, আচার-ব্যবহার, সংস্কৃতি, ভাষা- এসব কেমন হওয়া দরকার সে শিক্ষা তার জীবনের দিকে তাকালে অতিঅনায়াসে পাওয়া যাবে।
আর পাওয়া যাবে তার কালের ইতিহাস এবং ইতিহাসের ব্যাখ্যা। একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মধ্যবিত্ত পরিবারে এক যুবক কী করে গ্রাম থেকে শহরে এসেছিলেন, স্থানীয়কে নিয়ে গিয়েছিলেন জাতীয়ের কাছে এবং জাতীয়কে ভুলতে দেননি স্থানীয়ের দায়িত্ব সম্পর্কে, বিরূপ পরিস্থিতি ও বৈরী শক্তির সাথে কখনো আপস করেন নি, এবং কীভাবে অনুক্ষণ যুক্ত থেকেছেন সমষ্টিগত অগ্রগতির সংগ্রামের সঙ্গে, সে-ইতিহাস তার জীবনকাহিনীতে লেখা আছে। ওই ইতিহাসকে বুঝতে হলে তার কাছে যেতে হবে। আর আমরা তো এক পা’ও এগুতে পারবো না ইতিহাসকে অস্বীকার করে।
বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে ইতিহাস তার নিজের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তিটিকে খুঁজে নেয়। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার এক সঙ্কট মুহূর্তে তাজউদ্দীন আহমেদ ঐতিহাসিক একটি দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন এবং সে-দায়িত্ব যোগ্যতার সঙ্গে পালন করেছেন। পরবর্তীতে তিনি যে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন এবং প্রাণ দিয়েছেন তার কারণও ইতিহাসের ভেতরেই নিহিত। তিনি ইতিহাসে থাকবেন, এবং ইতিহাসকে বুঝতে সাহায্য করবেন; এবং সঙ্গী হবেন আমাদের অগ্রগতির সংগ্রামে।
তথ্যসূত্র
১. তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি, গ্রন্থাকারে প্রকাশিত চার খণ্ড, ঢাকা, প্রতিভাস, ১৯৯৯, এবং সাপ্তাহিক পত্রিকা সাপ্তাহিক-এ প্রকাশিত অংশগুলো
২. শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ঢাকা, ২০০২, দি ইউনিভারসিটি প্রেস লিমিটেড, পৃ ১১৭
৩. বদরুদ্দীন উমর, ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ, কতিপয় দলিল, দ্বিতীয় খণ্ড, বাংলা একাডেমি, ১৯৮৫, পৃ ৩৩৩
৪. শারমিন আহমদ, তাজউদ্দীন আহমদ, নেতা ও পিতা, ঢাকা, ঐতিহ্য, ২০১৪, পৃ ৬৫
৫. ডা. এস. এ. করিম, ঢাকা সেন্ট্রাল জেল, নানা রঙের দিনগুলি, ঢাকা, সেবা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, ২০০৮, পৃ ২৬
৬. ঐ
৭. অলি আহাদের সাক্ষাৎকার, বদরুদ্দীন উমর, প্রাগুক্ত, পৃ ৩৫৩
৮. অলি আহাদ, জাতীয় রাজনীতি, ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫, ঢাকা, খোশরোজ কিতাব মহল লিমিটেড, ১৯৯৭, পৃ ১০১
৯. হাজী গোলাম মোরশেদের সাক্ষাতকার, শারমিন আহমদ, প্রাগুক্ত, পৃ ২৮৮
১০. শহীদুল্লা কায়সারের সাক্ষাৎকার, বদরুদ্দীন উমর, প্রাগুক্ত, পৃ ২৬৪
১১. S. A. Karim, Sheikh Mujib, Triumph and Tragedy, ঢাকা, দি ইউনিভারসিটি প্রেস লিমিটেড, ২০০৫, পৃ ২৬৬
১২. এস. এ. করিম, প্রাগুক্ত, পৃ ১০
১৩. শারমিন আহমদ, প্রাগুক্ত, পৃ ২৮
১৪. বদরুদ্দীন উমর, আমার জীবন, তৃতীয় খণ্ড, ঢাকা, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ২০০৯, পৃ ২৬৪-৬৭
১৫. মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাক্ষাৎকার, ঈদসংখ্যা, সাপ্তাহিক, ২০১৪, পৃ ১৭৩
১৬. A. Qayyum Khan, Bittersweet Victory, A Freedom Fighter’s Tale, ঢাকা, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০১৩, ঢ়ঢ় ৯৩, ২২৪
১৭. সরদার ফজলুল করিম, স্মৃতিসমগ্র, ঢাকা, মওলা ব্রাদার্স, ২০০০, পৃ ২৮৬-৮৭
১৮. শারমিন আহমদ, প্রাগুক্ত, পৃ ১১০
১৯. ঐ, পৃ ৩৯৮-৪০৪
২০. ঐ, পৃ ১১২
২১. S. A. Karim, প্রাগুক্ত, ঢ়ঢ় ২৬৪-৬৬
২২. Nurul Islam, Making of a Nation, Bangladesh; An Economist’s Tale, ঢাকা, দি ইউনিভারসিটি প্রেস লিমিটেড, ২০০৩, ঢ় ২৫৯
২৩. S. A. Karim, প্রাগুক্ত
২৪. শারমিন আহমদ, পৃ ১৭৫
২৫. ঐ, পৃ ১৯৫, ৪৩৫
২৬. Nurul Islam, প্রাগুক্ত, ঢ় ২৫৭
২৭. শারমিন আহমদ, প্রাগুক্ত, পৃ ১৭৫
২৮. মোনায়েম সরকার, আত্মজৈবনিক, ঢাকা, ভাষাচিত্র, ২০১৪, পৃ ১৭৬
২৯. শারমিন আহমদ, প্রাগুক্ত, পৃ ১৯৯
৩০. ঐ, পৃ ১২৬
৩১. বাঙালির কণ্ঠ, সম্পাদক মোনায়েম সরকার, ঢাকা, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, ১৯৯৮, পৃ ২৮১
৩২. এস. এ করিম, প্রাগুক্ত, পৃ ১৬
৩৩. ঐ, পৃ ১