Sunday, July 23, 2017

লুঙুদু পালাহ- এক, দুই, তিন ও চার

[ফেসবুকে লংগদু পালাহ-১, ২, ৩, ৪ আকারে এই লেখাগুলো লিখেছিলাম। আরো কিছু বিষয়ে লেখার কথা থাকলেও আরো নতুন সমস্যা এসে যোগ হবার কারণে এবং কিছু ক্ষেত্রে তথ্যের মিসিং লিংকেজ থাকার কারণে আর এ বিষয়ে লিখিনি। তবে এই চারটি লেখা একত্র করে ব্লগে প্রকাশ করলাম। ধন্যবাদ]

লংগদু পালাহ-১
তারিখঃ ২৬ জুন, ২০১৭
চাদিগাঙ ছাড়া পালাহ হলো চাকমাদের চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে যাওয়ার কাহিনী। চাকমাদের একটি বিশ্বাস হলো, চাদিগাঙ ছাড়া পালাহ বা চাদিগাঙ পালিয়ে যাওয়ার গীতিকাহিনী যেখানে সেখানে গাওয়া যায় না। যদি এই গীতিকাহিনী কোনো গ্রামে গাওয়া হয়, তবে সেই গ্রাম থেকে সবাইকে পালিয়ে চলে যেতে হয় বা সেই গ্রাম চাকমাদের হারাতে হয়। চাদিগাঙ ছাড়া পালাহ’র মতো চাকমাদের এখনো নিজেদের গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হতে হয়। বিগত ৪০/৪৫ বছরের মধ্যে চাদিগাঙ ছাড়া পালাহ’র মতো চাকমাদের কতো গ্রাম যে ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে তার সঠিক হিসাব আসলে কোথাও নেই। কিন্তু যেই গ্রাম বা এলাকা তাদের ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে, সেই গ্রাম বা এলাকায় কেউ চাদিগাঙ ছাড়া পালাহ না শুনেও তাদেরকে নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। অর্থাৎ, চাদিগাঙ ছাড়া পালাহ বা গীতকাহিনী শুনলেও যে চাকমাদের নিজেদের গ্রাম ছেড়ে যেতে হবে তা হয়তো সঠিক নাও হতে পারে।
চাকমাদের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য জাতিসত্তারও নিশ্চয়ই এই ধরণের গীতিকাহিনী থাকতে পারে। অথবা নাও থাকতে পারে। তবে কেউ যদি লংগদু এলাকার জনগণের দুঃখের কাহিনী গীতিকাহিনী হিসেবে চাদিগাঙ ছাড়া পালাহ’র মতো করে রচনা করতো, তবে তা শুনতে কেমন হতো জানা নেই। চাদিগাঙ ছাড়া পালাহ এমন করুণভাবে গাওয়া হতো যে, যারা এই কাহিনী শুনতো তাদেরকে কাঁদতে হতো। কেউ কি লংগুদুবাসীর দুঃখের কথা করুণ সুরে লংগুদু পালাহ হিসেবে রচনা করতে এগিয়ে আসবেন?
সে যাই হোক, আমি এখানে লংগুদুবাসীদের দুঃখের কাহিনী বর্ণনা করার সাহ দেখাবো না। তবে সেখানে গতকাল গিয়ে যা দেখে এসেছি এবং শুনে এসেছি তার কিছুটা বর্ণনা করার চেষ্টা এখানে করবো।
জীবনের শেষভাগে এসে অশ্বিনীকুমার কার্বারীর উপলব্ধি
অশ্বিনী কুমার চাকমা। তিনি তিনটিলা গ্রামের কার্বারী। বয়স প্রায় ষাট বা সত্তরের কাছাকাছি। বেঁটেখাটো মানুষ। সবসময় হাসিখুশিই থাকেন। তার ঘরও এবার পুড়ে গেছে। ১৯৮৯ সালের ৪ মে প্রথমবার তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে গিয়েছিল। সাথে তাদের গ্রামও পুড়ে গিয়েছিল। আমরা একসাথে তিনটিলার পোড়া ঘরগুলো দেখতে গিয়েছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে তিনি বললেন, সবকিছু ধ্বংস হবার পরে, সবকিছু পুড়ে যাবার পরে এখন তিনি আর নতুনভাবে সবকিছু গড়ে তোলার আশা করেন না। একজীবনে আর কতোই বা সম্ভব? কত কষ্ট করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, দীর্ঘ বছর তিলতিল পরিশ্রম করে একএকটি পরিবার নিজেদের সম্পদ-সম্পত্তি বাড়িয়ে তুলেছিল এবং ঘরবাড়ি তুলেছিলো। একটু শান্তির আশায় তারা এই ঘরবাড়ি তুলেছিল। জীবনের বাকি সময়টা সুখে শান্তিতে তারা কাটাতে চেয়েছিল। কিন্তু ১৯৮৯ সালের পরে আবার তাদের শেষ বয়সে এই দশায় পড়তে হলো। তিনি কোনো প্রকার বিরক্তি ও দুঃখ না দেখিয়ে হেসে হেসেই বললেন, ’এই জিঙানিত আর নুও কিজু গুরিবার আঝা ন গরঙআর। গুরিলে পো শা’উনে গুরিবার চেরেস্তা গুরি পারঅন। আমি দ আর পারিদঙ নয়। বয়চ দ ওই জিএগোই, কদক আর পারে আর?’
জুম্ম জনগণের এই এক আপদ! দুঃখের কথাও তারা এমন হেসেখেলেতাদের জীবনের দুঃখ বেদনার কথা বলে যে, মনেহয় এই দুঃখ-কষ্ট কিছুই নয়! আসলে প্রতিনিয়ত দুঃখের মাঝে থাকতে থাকতে দুঃখ ও সুখ এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য করতেও যেন আমরা ভুলে গেছি!
অশ্বিনী কুমার চাকমা যে কথা অক্লেশে বললেন, তা যে কত ক্লেশকর, কত বেদনাময় ও খেদযুক্ত তা সাদাকথায় বোঝানো চাট্টিখানি কথা নয়। একজন মানুষ তার জীবনের প্রারম্ভিক পর্বে একবার নিজের বাড়িঘর ধ্বংস হতে দেখার পরে, নিজের আত্মীয়স্বজনকে মারা যেতে দেখার পরে, নিজের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হবার পরে, পালিয়ে পালিয়ে জীবন কাটানোর পরে আবার নতুন করে যখন সে স্বপ্ন দেখা শুরু করলো। এবং তারপরে জীবনের শেষভাগে এসে সে যদি দেখে যে, সে সারাজীবনে যা সঞ্চয় করেছিল, যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তিলেতিলে গড়ে তুলেছিল, তা কারো প্রতিহিংসার আগুনে লেলিহান শিখা হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেছে, সে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। তখন তার জীবন নিয়ে আর তখন কীইবা ভাবার আছে বা কীইবা ভাবার থাকতে পারে?
তাই অশ্বিনী কুমারেরও আর কিছুই ভাবার নেই! বাকি যা ভাবার আছে তা হলো, মরণ যেন ভালভাবেই হয়!


লুঙুদুত ধজা-পড়া-লড়া-পুড়া হেই পানা পালাহ-২
তারিখঃ ২৬ জুন, ২০১৭
লুঙুদুত জিওংগে আদিক্ক্যেগুরি। এককধায় যেবার কধা ন থ্যালেইও জানা। জেবার আগে তারাত্তেই কী নেজেই দিম চিদে গুজ্জোং। একজন'অর আর কদক তেঙা থাই! শেজেনদি ১০ কেজি আম কিনিলুং। সিউন যারে পারঅং হাবেবার চিদে থেব'অ গুরি নেজেইলুং। লুঙুদুত ম সমারে একজন গুরো ভেই আর মটরসাইকেল চালিয়েবো এল'অ। 
আমি লুঙুসুত জেইনেই পুড়া জিইয়ে আদাম'অত সুমিলং। এগগান আ' পুড়িই জিইয়ে ঘরত পানি হেবাত্তেই উদিলং। সি'ওত কধা অহল'অ ঘর আদ্যান্যা পুড়িই জিইয়ে মানজো সমারে। পরিচয় অহল' একজনদোই, য্যা ভেইয়ে ভেইয়ে মরামরিত তা নেককোরে আহরেইয়ে। তুমি সুবীর ওস্তাদ'অ নাং শুনি থেবা।
আমি আমা হিল চাদিগাং-অর বিজগ'অর এমন এগগান সময় পা'আর গুরির, জিওত ভেইয়ে ভেইয়ে মরামরি দেঘির। আহরেইয়েই আমা পরিচিত অপরিচিত ইত্তোকুদুম। আহরেইয়েই আমা জাদ'অর বাজা বাজা গম মানুচ্চুনোরে। ইওত তারা নাং আর ন তুলিম আর। তবে পোল্লেম পোল্লেম জ্যাক্কেনে জেএসএস এম এন লারমা পন্থীলোই ইউপিডিএফ'অর আইপা'আপি অহর স্যাক্কেনে মুই দীঘিনালা ভৈরফা সিন্দি তারার একজনদোই বেড়েইওং। সে মানুচচোরে লইনেই কধা রু'উত্তেদে, ত্যা আমা মানুচ জেদাবাদে আগুনওত পুড়িই মারেই ফেলেইয়ে। পোল্লেম পোল্লেম আই'পা'আপি লক্কেনে মুই তাল্লোই এক সমারে দিন্নোবো আর রেত্তোবো কাদেইওং। আমি একসমারে চাগালা থিগে বেড়েইয়েই, আমা আদাম্যাউনোরে জাগাজুমি বাজেবাত্তেই সাহজ দেই। তবে পরে ভালকদিন পরে শুনংগে তারে আর'অ কনজনে মারেই ফেলেইওন। তা মোক পো ঝি উনোর কধা মুই এব'অ মনত তুলোং। তারা কেনজান আঘন মুই হবর ন পাং। তবে সে সহযোদ্ধা বড়ভেইবো মুরিবার পরে মুই মনত দুক পিওং। তার নানা ভুলচুক থ্যালেও তার মরানাই মুই নিজ'অ সহযোদ্ধা ধুক্কেন মনত কস্ত পিওং।
লুঙুদুত থাগত্তে সিদু হানক্কন মুই সুবীর ওস্তাদ'অ মোককোলোই কধা কুইওং। তারার সুক-দুঘ'ও কধা বুজিবার চেস্তা গুজ্জোং।
ইঙিরি আদামে আদামে জাগায় জাগায় আমা জুম্ম মানেইওর কত'অ মিলে মা-বোন তার/তারার পো-ভেই-নেক-বাপ আহরেইওন! সুবীর ওস্তাদ'অ মোক্কো কধা চিদে গুরিই মত্তুন মনত উত্তে তারা বেগ'অর কধা।
মত্তুন মনত উত্তে ম বাপপো কধা। মনত উত্তে আর'অ বাপ-জিদু-আজু-দা-হাক্কা ইত্তোকুদুমবলা বা ইত্তোকুদুম ন উইয়ে আর'অ শত শত আমা শহীদ মানেইওর কধা।

লুঙুদু পালাহ-৩
তারিখঃ ২৭ জুন, ২০১৭
১৯৮৯ সালের ৪ মে। লুঙুদুতে যে হামলা হয়েছিল তাতে নিহত হয়েছিল ৩২ জন বা তারও অধিক। ঘরবাড়ি পুড়ে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছিল ১ হাজারেরও অধিক। হামলা-হত্যার শিকার হয়ে পাহাড়ি জনগণ জায়গাজমি হারিয়েছিল শত হাজার একর।
লুঙুদুতে ১৯৮৯ সালে সংঘটিত হামলা নিয়ে ব্রিগ্রেডিয়ার সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম লিখেছেন,'.. বাঙালীরা উত্তেজিত হয়ে কতিপয় ভিডিপি সদস্যদের সহযোগীতায় ঘটনার দিন এবং তার পরদিন আগ্নেয়াস্ত্র, দা, বল্লম, কুঠার ইত্যাদি মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে করল্যাছড়ি, উল্টাছড়ি, শীলছড়ি, বগাপাড়া, আদ্রকছড়া এবং হরকুমার কার্বারী পাড়ায় উপজাতিদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, লুটপাট চালায় এবং লোকজনকে আক্রমণ করে।(পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিপ্রক্রিয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতির মূল্যায়ণ; ফেব্রুয়ারি, ২০০১; পৃষ্ঠা-১৩৪)। এই উদ্ধৃতিতে যে সকল গ্রাম বা এলাকার নাম দেয়া হয়েছে তার অনেক এলাকায় এখন পাহাড়ি জনগণ বসতি বজায় রাখতে পেরেছে কীনা তা আমার জানা নেই। তবে সাধারণভাবে পার্বত্য প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে চোখ বন্ধ করেই বলে দেয়া যায় যে, এই এলাকার শত হাজার একর জায়গা থেকে পাহাড়িরা সেটলারদের কাছ থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়েছে এটাই বাস্তবতা। (যারা এ বিষয়ে জানেন তারা প্রকৃত তথ্য যোগ করতে পারেন)
সে সময় জুম্ম জনগণের উপর যে অত্যাচার অন্যায় অবিচার করা হয়েছিল তার প্রতিবাদ করারও সুযোগ তখন পার্বত্যবাসীকে দেয়া হয়নি। রাজা দেবাশীষ রায় তাঁর এক ফেসবুক নোটে এমনেস্টির উদ্ধৃতি দিয়ে এই তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রাঙামাটির জনগণকে বা প্রতিবাদ করার জন্য ঢাকায় পর্যন্ত যেতে বাধা দেয়া হয়েছিল।
সুতরাং, তখন এই অন্যায়ের প্রতিবিধান করার জন্য থানায় গিয়ে মামলা করার চিন্তাও কেউ করার সাহস করেনি। অথবা, মামলা যে করা যায় তা কারো মাথায়ও ছিলো না! অথবা দেশে বিদেশে এ নিয়ে প্রতিবাদ মিছিল সভা সমাবেশ করারও তেমন অনেক কেউ ছিলো না। তাছাড়া তখন দেশে ছিলো সামরিক শাসনের সময়। যে সকল পত্রিকা প্রকাশিত হতো তা ছিল সামরিক সরকারেরই নিয়ন্ত্রণে। এমন পাহাড়ি কোনো সাংবাদিক ছিলেন না বা সাহসী কোনো সাংবাদিক তখন সাহস নিয়ে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে পোড়া ঘরের ছবি তুলতেও আসেননি। বরং ঘটনাকে ভিন্নভাবেই হয়তো তখন দেশবাসীর কাছে তথ্যমাধ্যমের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছিল। এবং এতে জায়েজ বা বৈধ হয়ে গিয়েছিল একটি গণহত্যা সংঘটনের। পাহাড়িদের তাদের বাপদাদার ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদকেও এভাবেই হয়তো/নিশ্চিতভাবেই বৈধতা দিয়ে দেয়া হয়েছিলো।
কিন্তু এই আজকের ২০১৭ সালে এসে তার মাত্রা ও প্রকৃতির কিছুটা হেরফের হলেও নীতিগত দিক থেকে অধিপতি শ্রেনীর অবস্থান 'যা লাউ, তা কদু'ই রয়ে গেছে কীনা এই প্রশ্নটি জুম্ম ও সচেতন মহলের কাছ থেকে বারবার প্রকটিতই হচ্ছে।( ড্রাকোনিয়ান ৫৭ ধারা এখন আর সাদাসিধে সোজাসাপ্টা দুর্মুখ কথা বলতে উতসাহিত করে না বটে!)
তথ্য হলো ঘটনাত পরে প্রশাসন বাদী হয়ে সেটলার বাঙালিদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে। মামলার ধরণ কী আমরা জানি না। মামলায় ব্যাপক মানুষের নাম উল্লেখ করে প্রকৃত পরিকল্পনাকারী ও হামলা বাস্তবায়নকারীদের আড়াল করা হচ্ছে কীনা তাও স্পষ্ট নয়। এছাড়া পাহাড়িদের দেয়া মামলায় এখনো বৃদ্ধা গুনমালা চাকমা হত্যার বিষয়টি যোগ করা হয়নি। অর্থাৎ যোগ করা হয়নি ৩০৭ ধারা। অন্যদিকে গত ২৫ জুন লুঙুদুতে গিয়ে জানা গেলো, ঘটনার মূলে যারা রয়েছে বলে সন্দেহের তালিকায় রয়েছে, তাদের মধ্য থেকে ৩৪ জন এরইমধ্যে উচ্চ আদালত থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন নিয়ে প্রকাশ্যেই ঘোরাফেরা করছে। এর মানে হলো যারা হামলায় জড়িত তারা এখন মুক্তভাবেই ঘুরছে, তারা ক্ষতির শিকার পাহাড়িদের সামনেই ঘোরাফেরা করছে।
উপরন্তু যোগ হয়েছে পাহাড়িদের ৪০ জনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা। মামলাটির সত্যতা শুন্যের চেয়েও নিম্নাংকে হলেও তার প্রায়োগিক দৃশ্যমান 'হুমকি ও ধামকি'দেয়ার যে 'বারতা বা বার্তা' রয়েছে, তা আমাদের সবাইকে শুধু ভাবাবে না বলে দুর্ভাবনা ও দুশ্চিন্তারও যে কারণ হবে তা-ই সত্য।
তদুপরি পার্বত্য সমস্যা 'আইনশৃংখলা জনিত' কোনো সমস্যা নয়। মামলা ও পালটা মামলা দিয়ে এই সমস্যার তিল পরিমাণ সুরাহার আশা করা দুরূহ বটে।
রাজনৈতিক দিকটি ও জুম্ম জনগণের অধিকারের দিকটি প্রাধান্যে না আসলে পার্বত্য সমস্যাটির অবস্থা 'সব সমস্যা Problem করে' দেয়ার মতো অবস্থা হবে এই আরকি!?!?

লুঙুদু পালাহ-৪
তারিখঃ ২৮ জুন, ২০১৭
লুঙুদু বাজার। সপ্তাহের শনিবার সেখানে সাপ্তাহিক বাজার বসে। ছিটেফোটা কয়েকটি বাদে বাকি সব দোকান বাঙালিদের মালিকানাধীন।
পাহাড়ে সচরাচর যা হয়, দোকানদার ও ব্যবসায়ীদের প্রায় সবাই অপাহাড়ি সেটলার অথবা সাধারণ বাঙালি। পাহাড়িদের জন্য ব্যবসা নিষিদ্ধ তা নয়! তবে ব্যবসা বা দোকানদারী করে টিকে থাকাটা হলো 'কল্পনাবিলাসীতা'রই মতো। কেউ আড়ম্বর করে দোকান দিলো বা ব্যবসার পত্তন ঘটালো। যে কোনো কৌশল বা উপায়ে হোক সেই দোকান বা ব্যবসা বা পুঁজির উপর থাকবে 'শকুনী মামা'র চোখ। শেষে কোনো উপায়ে ঠেকাতে না পারলে আগুন লাগিয়ে দিয়ে ধ্বংসসাধন বা সর্বনাশ করার কৌশল তো আছেই। এক কথায় অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে রাখার কৌশল বলা যায়। তবে এতোসব বিপত্তি বাধার মধ্যেও মানুষ তো আশার মুখ না দেখে বেঁচে থাকতে পারে না।
লুঙুদু বাজারে এখনো পাহাড়িরা খুব কমই যায়। বলতে গেলে এখন বাজার মেলেনা। পাহাড়ি জনগণ এখনো বাজারে যেতে ভয় পায়।
লুঙুদুতে পাহাড়ি ও অপাহাড়ির অনুপাত অনেক আগে থেকেই ব্যালেন্সের মধ্যে নেই। সেটলার ও সাধারণ বাঙালি যেখানে ৫০ হাজার, সেখানে পাহড়ির সংখ্যা মাত্র ১৫ অথবা ১৬ হাজার।
পোড়া ঘরের ভিটেমাটিতে ফেরারও যেন কোনো তাড়া নেই পাহাড়ি জনগণের! ঘটনা ঘটেছে জুন মাসের ২ তারিখ। ২৫ জুন পর্যন্ত ধরলে ২৩ দিন হলো পাহাড়িদের পুড়ে যাওয়া ঘর এখনো আগের মতোই যেভাবে পুড়ে ধ্বংস হয়ে ছিলো সেভাবেই আছে।
ক্ষতির শিকার গ্রামবাসীরা এখনো রাত কাটাচ্ছে দূরে প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামে আত্মীয় স্বজনের বাড়ি অথবা আশ্রয়কেন্দ্রে। তবে দিন হলেই তারা চলে আসছে তিনটিলা বনবিহারে। সারাদিন তারা সেখানে কাটিয়ে আবার চলে যায় নিরাপদ দূরত্বে।
ক্ষতির শিকার মানুষগুলোর অনেকটা এমন হয়েছে যে, কী আর হবে আবার নতুন করে ঘরবাড়িতে এসে!? নতুন করে ঘরবাড়ি তুলেও আর কী হবে? অনেকটা তিনটিলা গ্রামের কার্বারী অশ্বিনীকুমার চাকমা'র মতো হয়েছে সবার অবস্থা। এই জীবনে যা তিলে তিলে সঞ্চিত ধন, তার আকষ্মিক ধ্বংসসাধনে বিমূঢ় নির্বাক সকলে।
তাদের আগামী যেন থেমে গেছে!
সে যাহোক, আগামীকে রূদ্ধ করার সাধ্য কারোর নেই। তাই স্বাভাবিকের মতো আবার লুঙুদু ঘরপোড়া জনগণ তাদের ভিটেমাটিতে ফিরে আসুক এই আশা আমরা করতে পারি। লুঙুদুবাসী বা পার্বত্যবাসী বরাবরের মতো দাবি জানাতে পারে জীবন ও ভুমি বা বাপদাদার ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের শিকার যেন হতে না হয়, যেন ক্ষতির শিকার হতে না হয় সেই নিশ্চয়তা পাওয়ার। অথবা সেই গ্যারান্টি যদি নিশ্চিত না হয়, স্বাভাবিকের মতো নিজেদের রক্ষার জন্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা যে নিতে হবে তা-ই যে বাস্তব সত্য, এটাই যে বাস্তবতা, তা কেউ বেবুঝ হলেও নিশ্চয়ই বুঝে থাকবে।




রাঙামাটিতে পাহাড়ধসের কী কারণ?


Image may contain: tree, outdoor and nature

তারিখঃ ২৯ জুন, ২০১৭
মানসিক ও চিন্তাগত এবং কিছুটা কাজের চাপে আছি। তাই এ বিষয়ে সংক্ষেপে লিখছি।
সার্বিকভাবে সাধারণ মূল্যায়ন করে পাহাড়ধসের কারণ হিসেবে অনেকে নানা যুক্তি তুলে ধরেছেন। তবে বিশেষভাবে কোন এলাকায় কেন বা কী কী কারণে পাহাড়ধস ঘটেছে তা সম্ভবত এখনো চিহ্নিত করা হয়নি। গত ২৭ জুন আমরা দুইজন ঝটিকা এক সফরে পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা দেখে এসেছি। সময় কম থাকায় এলাকাগুলো ভালকরে পরখ করে ধ্বসের কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে যেসকল কারণে পাহাড়ধস হয়েছে তা সংক্ষেপে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে।

১। শহরাঞ্চলের যুবউন্নয়ন এলাকা, মোনোঘর এলাকায় মূলত, ড্রেইনেজ সিস্টেম বলতে কিছু না থাকার কারণে বৃষ্টির সময় পানির প্রবাহ উপচে গিয়ে মাটির ব্যাপক ক্ষয় হয়। এতে পাহাড় কেটে যারা পাহাড়গুলোতে ঘিঞ্জি ঘর তুলেছিল তাদের ঘরে মাটির আস্তর ধ্বসে পড়ে। এবং মানূষজন মারা যায়।
২। ভেদভেদি এলাকায় পাহাড়গুলো ন্যাড়া ও একভাবে লম্বালম্বিভাবে খারা এবং তারউপর পাহাড় আরো খারাভাবে কেটে উপরে নিচে টিনের ঘর বানানো হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে প্রবল বৃষ্টির পরে মাটির আস্তরে ধ্বস নামতে তেমন বেগ পেতে হয়নি।
৩। মানিকছড়িতে পথের পাশে অবস্থিত আর্মি ক্যাম্পের খারা পাহাড়ের মাটি আগে থেকেই ছিল ন্যাড়া। এখানেও দেখা গেছে পথের পাশে পানি প্রবাহের জন্য কোনো ড্রেইন তৈরি করা হয়নি।
৪। মানিকছড়ির সাপছড়িতে কয়েকটি জায়গায় রাঙামাটি-খাগড়াছড়ির পাকা পথের পূর্বদিকে পানি জলাবদ্ধ হয়ে আছে। অর্থাৎ, পূর্বদিকের পাহাড় থেকে যে পানি পশ্চিমদিকে নিচে নেমে যাবার কথা তা পাকা পথে বাধাপ্রাপ্ত হয়। পানি পশ্চিমূখী হয়ে নিচে নেমে যেতে পাকা পথের মাঝ বরাবর ড্রেইন বা কালভারট পর্যাপ্তভাবে বানানো হয়নি। এছাড়া পাহাড়ে লাগানো হয়েছে পরিবেশ অনুপযোগী সেগুন গাছ।
৫। খামারপাড়া এলাকা থেকে মোনতলা কিজিং পর্যন্ত এক কিলোমিটার মতন সড়কপথে প্রকৃতি যেন তার রূদ্ররোষ দেখিয়ে দিয়ে বলতে চেয়েছে, প্রকৃতির উপর জবরদস্তি সহ্য করা হবে না! সাপছড়িতে নিচু জায়গা ভরাট করে বানানো হচ্ছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ভরাট করার জন্য মাটি কাটা হচ্ছে খামারপাড়ার পূর্বদিকের একটি পাহাড় থেকে। পাহাড় এমনভাবে কাটা হচ্ছে যেন পাহাড় কাটা অবৈধ নয়!
৬। খামারপাড়া এলাকায় যেখানে পাকা সড়ক চিড়ে ভেঙে পথকে উত্তর ও দক্ষিণ দু'দিকে পৃথক করে দিয়েছে সেখানে একটি স্বাভাবিক ছড়া বা নালার সৃষ্টি হয়েছে। ছড়া বা নালাটির অস্তিত্ব অনেক আগে ছিল। কিন্তু পাকা পথ বানানোর সময় নালাটিতে খুব কম পানি প্রবাহের উপযোগী করে ছোট করে বানানো হয়েছে। তাই ১২-১৩ জুন যখন প্রবল বৃষ্টি হয় তখন প্রকৃতি স্বাভাবিকভাবেই নিজের ন্যায্যতা আদায় করে ছেড়েছে।
৭। মোনতলা কিজিং-এর ক্ষেত্রেও কথাটি সত্য। কিজিং শব্দটি থেকে বোঝা যায় এই জায়গাটিতে দুই পাহাড়ের মাঝে চলে যাওয়া খাদ বা হাঁটা পথ ছিল। পরে পাকা সড়ক বানানোর সময় সেই কিজিং ভরাট করে তার চিহ্ন নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। ১২-১৩ জুন সুযোগ পেয়ে প্রকৃতি আবার তার জন্য নতুন কিজিং তৈরি করে নিয়েছে। এখানেও পাকা সড়ক উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় ৫০ ফুট বা তার অধিক চিড়ে পৃথক হয়ে গেছে।
৮। রাঙামাটি খাগড়াছড়ি সড়কের পূর্বপাশের অনেক খারা পাহাড়ের মাটি ধ্বসে পড়েছে। এগুলো আগামীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এরকম স্থানের সংখ্যা ৫০/৬০ এর কম হবে না। কেন এগুলো ধ্বসে পড়েছে ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে? একে একে বলা যায়- পাহাড়ের মাটি ঝরঝরে; পথ নির্মাণকালে অবাধে পাহাড়কে খারাভাবে কাটা হয়েছে; বৃষ্টির সময় পথের পানি বেয়ে যাবার জন্য কোনো ড্রেইন করা হয়নি; মাটির যাতে ক্ষয় না ঘটে সেরকম কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
৯। ঘিলাছড়ি ও তার আশেপাশের এলাকায় পাকা সড়ক ঢালু হয়ে ফেটে গেছে বা কিছু অংশ ধ্বসে গিয়ে কয়েকশত ফুট নিচু খারা ঢালু? তৈরি হয়েছে। এগুলো এতোটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে, কোনো গাড়ি বা ব্যক্তি নিচে পরে গেলে নিশ্চিত জীবন বিপন্ন হয়ে উঠবে।
কেন এই ধ্বস? সেই একই কারণ, ড্রেইন নেই এবং মাটির ক্ষয় রোধ করার ব্যবস্থা নেই।
সে যাই হোক, ধ্বসের পরে কারণ নির্ধারণ করা সহজ।
তবে এই কাজটি করা প্রয়োজন ছিলো।
এছাড়া কেন প্রকৃতি প্রবলভাবে 'বৃষ্টির ধারা' সৃষ্টি করেছিল তার আবহাওয়া বা জলবায়ুগত বিশ্লেষণ করা দরকার।
পার্বত্য মন্ত্রণালয় পাহাড়ধসের কারণ হিসেবে বজ্রপাতকে দায়ী করেছে। তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকলে ঠিক আছে। তবে 'ফাল্টুমি' ও 'ছ্যাবলামি' করার জন্য বা দায়সারাগোছের অনুসন্ধান করে দায়সারা এই 'কারণ' চিহ্নিত করে থাকলে দায়িত্বপ্রাপ্তকে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
দায়িত্বজ্ঞানহীন অনুসন্ধান...।

লুঙুদুতে প্রাণ আমারঃ তুক্কোপুদি’র দুঃখের কথা শোনাই তবে!

তারিখঃ ০৪ জুন, ২০১৭
শোনো বলি এ কথা,
আমি গল্প লিখতে বসিনি,
লিখতে বসেছি হিল চাদিগাঙের
ছড়া ঝিড়ি নদী নালা বন বাদাড়ের
গেনখুলী ধুধুক হেংগরং বাজি শিঙার কথা!
লুঙুদু যেন সারা পার্বত্য চট্টগ্রামের দুঃখী মানুষের প্রতীক হয়ে উঠতে শুরু করেছে। সেই ১৯৮৯ সালের ৪ মে তারা একবার আক্রমণের শিকার হয়েছিল। ঘরবাড়ি সহায়সম্পত্তি আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে গিয়ে সর্বস্বান্ত হতে হয়েছিল তাদের। তারপর আরো চলে গেছে যুগ ধেয়ে আরো অনেক বছর। ৮৯ সালের সেই দুঃস্বপ্নের স্মৃতি তারা হয়তো ভুলতে বসেছিল। তাই হয়তো তারা আশায় বুক বেঁধে পাকা ঘর দালান বানাতে শুরু করেছিল।
তারা ভুলে গিয়েছিল, এমন এক সময় ছিল পার্বত্যবাসীরা সুন্দর করে ঘর তুলতে, ভালোমতো ঘর তুলতে চিন্তা করতে পারতো না। তারা ভুলে গিয়েছিল পাকা দালান কেন সাধারণ বাঁশের বেড়া দেয়া ঘর তারা একসময় বানানোর চিন্তা করতো না পাছে সেটলার হামলায় সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে তাদের সহায় সম্পদ আবার পুড়ে যায় এই দুর্ভাবনায়। তাই তারা তুলতে শুরু করেছিল পাকা দালান!
তারপর এলো ০২জুন, ২০১৭ শুক্রবারের এক সকাল! এবং তারপর পুড়ে গেল তাদের বাড়িঘর, সহায় সম্পত্তি। সাধের স্বপ্ন তাদের ধ্বংস হয়ে গেল। তাই মনের দুঃখ নিয়ে বুকের কোণ থেকে একবুক আবেগের দলা উগরে দিয়ে বুদ্ধ কুমার চাকমা চিৎকার না করেই সিধে ও সাদা ভাষায় বলে ওঠেন, আমাদের ত্রাণ লাগবে না, মেলে ফেলেন। কী এক শুন্যতা পেয়ে বসলে ভদ্র এক গেরস্থের কাছ থেকে এই কথা উঠে আসে তা কি কেউ জানবে বা কেউ কি বুঝবে?
বাহাস বাদ রেখে আজ বলবো উত্তর মানিকজুর ছড়া গ্রামের তুক্কোপুদি নামে এক নারীর কথা। তিনি তার গ্রামে বসবাস করছেন সেই ছোটোকাল থেকে। বিয়ের বয়স হবার পরে কয়েকজন সন্তান হবার পরে তিনি হারান তার স্বামীকে। তারপর সংসারের ভার কাঁধে নেন। ছেলে মেয়েদের মানুষ করার চেষ্টা করেন। এখন বয়স হবার পরে নাতি নাতনিদের আদর ভালবাসা দিয়ে পুত্র কন্যাদের ঘরে ঘরে ঘুরেফিরে আদর আপ্যায়ন যা পাবার তা পেয়ে বাকি দিন কাটানোর কথা। কিন্তু ভাগ্যে যখন লেখা থাকে দুর্ভাগ্যের লিখন, তখন কে তারে সুখে রাখে! কর্মের বাঁধন যে যায় না খন্ডন! দুঃখ যেন লিপির লিখন তার কপালে!
সকালে ঘুম থেকে উঠে তুক্কোপুদি ভাত রান্না করার পরে আয়েশ করে তার নাতিনদের সাথে মশকরা খুনসুটি করে সময় কাটাচ্ছিলেন। সময় বেশ কাটছিল বটে! কিন্তু মানিকজুর ছড়া বিলের ওপারে তিনি দেখতে পেলেন ধোঁয়া উড়ছে, আগুন লেগেছে, চলছে চিৎকার। মানুষজনের পালিয়ে আসার স্রোত তিনি দেখতে পেলেন। দূর থেকে তা দেখেই তিনি নিজের ঘরের উঠানে বসে আপন মনে জীবনের কথা হয়তো ভাবছিলেন। এবং চিন্তা করছিলেন, আপন জাতভাইবোনদের ঘরবাড়ি পুড়ে গেল। বাঁচাতে পারলো না কিছুই। পরিচিত আত্মীয় কেউ মারা গেল কি না তা নিয়ে হয়তো তিনি দুশ্চিন্তা করছিলেন। তিনি ভাবতে পারেননি, বিরাট একটি ধান ক্ষেতের মাঠ পেরিয়ে সেটলাররা মানে দুর্বৃত্তরা তাদের গ্রামেও আসবে! হয়তো তিনি তার জন্য এক কাপড়েই প্রাণ নিয়ে ঘর থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন আরো কিছুক্ষণ পর!
তারপর তিনি দেখলেন ৫শত বা ৬শত বা তারও অধিক সেটলার ধেয়ে আসছে তাদের গ্রামের দিকে। গ্রামের সমর্থ জোয়ান মরদ পুরুষরা রণসজ্জ্বা নিয়ে কান্তা বাদল দা কুড়াল বিয়োঙ খন্তা বা হাতে যা পেল তা-ই নিয়ে গ্রাম বাঁচাতে রুখে দাড়ানোর উদযোগ করলো। শুরু হলো চিৎকার চেঁচামেচি। পুরুষ ও নারীরা একযোগে চিৎকার দিলো, উজোও উজোও, বাঙালুনে আদাম ঘিরদন, উজোও উজোও! গ্রামের নারীরা বুদ্ধ ভগবানের নাম নেয়া শুরু করলো। কিন্তু তারপরও তারা তাদের ভবিতব্যকে ছেড়ে দিলো কপালের হাতে! এবং এভাবে গ্রামের শক্ত সমর্থ নারী ও পুরুষরা রুখে দাঁড়ালো আধ থেকে পৌনে একঘন্টার জন্য। তারা কান্তা বাদল দিয়ে ’দুর্বৃত্তদের’বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলো। রুখে দাঁড়াবো না কেন, জুলি ন উধিম কিত্তেই, কবিতা চাকমার এই কবিতাটি তো তারা পড়েনি!
কিন্তু এ কি! দুর্বৃত্তদের সামনে ’চিদিরে ভদরা’ ওরা যেন কারা? দুর্বৃত্তদের হয়তো প্রতিরোধ করা যায়! কিন্তু যাদের হাতে থাকে আইন ও শক্তির লম্বা হাত, তাদের সাথে এই নিরীহ গ্রামবাসীর কীইবা করবে? এযাবৎ বছরের পর বছর তো তারা এই শক্তির পুজো করে এসেছে ঘরে, গ্রামে, ঝাড়ে, হাটে বাজারে বা পথেঘাটে! তারা আইনী হোক বা অপ্রকাশ্য যে কোনো শক্তিই হোক!
তাই তারা, মানে গ্রামের জনগণ মানে জুম্মা খাপ্পোআ সহজ সরল পাহাড়িরা এবার ’রণে ভঙ্গ’ দিয়ে পিছাতে শুরু করলো। ’য পলায়তি স’ জীবতি’ এই মন্ত্রকে ধারণ করে তারা জীবন বাঁচানো ’ফরজ’ দর্শনকে বাস্তবে রূপ দিল। তারা একান্তভাবেই নিজের প্রাণই তাই হাতে নিয়ে যেতে পারল! নিতে পারলো না সহায় ও সম্পত্তি, এমনকি ’উড়ন পিনন’ মানে পরিধানের কাপড় তা-ও তারা সঙ্গে করে নিতে পারলো না। তারা পালাতে লাগলো। শয়ে শয়ে তারা বাঁশঝাড়, ঝোপঝাড়, আসামলুদি বন, গাছবাঁশ বাগান, ঘেরা দেয়া বেড়া ডিঙিয়ে যেতে লাগল দূর পাহাড়ে! এবং তারা পিছনে দেখার সময়ও খুব কম পেল। কিন্তু যে-ই পিছনে তাকিয়ে দেখল, সে-ই দেখল, দূরে,ওই দূরে, যেখানে তাদের চিরচেনা গ্রাম রয়েছে সেখানে উড়ছে লেলিহান শিখা, বাজছে দামামা! ফুটছে বাঁশ। একইসাথে তাদের ’চিদঅ বদু’ মানে বুকের একান্ত ভেতরটা টনটন করতে লাগল। তবু তারা খুশী যে প্রাণটা তো বাঁচলো!
এভাবেই তুক্কোপুদি নিজের গ্রামে থেকে ০২ জুন সকালে পালিয়ে গিয়েছিল। তারপর এক কাপড়ে তার আশ্রয় হলো ভুইওছড়া নামে এক গ্রামের জুনিয়র স্কুলের একটি বারান্দায়। সেখানে সে আজ ৪ জুন অবধি রইল বসে জেগে ঘুমিয়ে বা চিন্তা দুশ্চিন্তা করে। এদিকে তার নাতিনরাও এসেছে তার সাথে। তাদেরকে নিয়ে কাটতে লাগল যাকে বলে উদ্বাস্তু জীবন! কেউ কি বুঝবে তুক্কোপুদির দুঃখের কথা? তার বুকের ভেতরের হুুহু চোখের পানি ছাড়া কান্না ও একরাশ শুন্যতার কথা। চোখের পানি কি সহজে আসেেএই পোড়ার জুম্মমিলা বুড়োমিলার চোখে! কিন্তু তার মন কি তবে কাঁদে না। কেঁদে ওঠেনা কি তার আবেগ! মনে কোণে কি অশ্রু ঝড়ে না তার?!
তুক্কেুপুদি শুধু একা নেই এই স্কুলে। সাথে রয়েছে তিন গ্রামের উদ্বাস্তু আরো অনেকেই।
হামলার দিন০২ জুন রাতটি তারা কাটালো। ০৩ জুন তারা ভয়ে ভয়ে কেউ যেতে চাইল তাদের গ্রামে। কী অবস্থা হয়েছে তাদের বাড়ির তা জানতে তারা সেখানে যেতে চাইল। কিন্তু ’বেলে সেন্টার’ বা ’গুজবীয় ব্রডকাস্টিং করপোরেশন’ থেকে তারা জানতে পারলো, পুলিশ নাকি জানিয়ে দিয়েছে, গ্রামে তিনজনের বেশি ঘোরাফেরা করলে এরেস্ট করা হবে। আচ্ছা জ্বালা বটে! কিন্তু, আইনী শক্তির কথা তো ফেলনা নয়! তাই তারা গ্রামে গেলে তিনজন একসাথে যায়। ভুলেও তারা ৪ জন একত্র হয়ে গ্রামের দিকে পা বাড়ায় না।
তুক্কোপুদির পরিবারে সাকুল্যে রয়েছে ৫ জন। তিনি রয়েছেন, রয়েছে তার এইচএসসি ফাইনাল দেয়া একটি পুত্রধন, সাথে তার কন্যা ও কন্যার জামাই। আর রয়েছে একটি নাতিন। তার পুত্রধন এইচএসসি পরীক্ষা দেবার পরে গ্রামে এসেছে। এসেই পরে গেল অঘটনে। কন্যার জামাই একবার তাদের গ্রামের বাড়ি দেখতে গেলেন। দেখলেন পুড়ে গেছে তাদের ঘর।কিছুই অবশিষ্ট নেই। পুড়ে গেছে ঘরের যাবতীয় সরঞ্জাম। হাড়িপাতিল তো পুড়ে গেছেই! পুড়ে গেছে বালিশ, পাটি, বুরগি, পিনন, খাদি, লুঙ্গি বা গামছা। পুড়ে গেছে খাট পালংক, খাটিয়া আলনা, ছিল ছিল একটি আয়না। তাও নেই! কিছুদিন আগে মাত্র তাদের পরিবার জমি থেকে ধান কেটে কিছু বস্তায় কিছু খোলা জায়গায় রেখে দিয়েছিল। এই ঝুমঝুম বৃষ্টির মাঝেও তুক্কোপুদির কন্যার জামাই দেখতে পেেেলন, ধানগুলো পুড়ে গেছে। কিছু আছে বটে তবে ঝেড়ে মুছে খেলে তিতাই লাগবে। তাদের জমি থেকে তারা এবার দুইশ আড়ি মানে প্রায় ১ হাজার বা তারও বেশি কেজি ধান পেয়েছিল। সব শেষ হয়ে গেছে।
কী আর করা! তিনি ফিরে এলেন ভুইওছড়া জুনিয়র স্কুলের রুমে। সেখানে তিনি খোলা জায়গায় এলিয়ে দিলেন গা। তারপর চিন্তা করা ছেড়ে দিলেন।
এবার বলি তুক্কোপুদি চাকমার আরেক মেয়ের কথা! মেয়ের নাম শিমলিতা চাকমা। তাদের গ্রামেই শিমলিতা মানে তুক্কোপুদি চাকমার কন্যার ঘর। তাদের বাড়িতে রয়েছে ৫ জন। শিমলিতা নিজে, তার তিনটি কন্যা, আর তার শিমলিতার স্বামী। তিনটি কন্যার মধ্যে একটি পড়ে ৮ম শ্রেনীতে। আরো দুইজন আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষা দেবে। তাদের সবার বইপত্র খাতা কাগজ কলম পুড়ে গেছে সাম্প্রদায়িকতার লেলিহান শিখায়।
তারাও তাদের মা তুক্কোপুদিদের সাথে ভুইওছড়া গ্রামের জুনিয়র স্কুলের রুমে এখন আশ্রয় নিয়েছে।
আরো দূরে আদরকছড়া গ্রামে বাস করে তুক্কোপুদি চাকমার আরেক কন্যা। সে জানিয়েছে আগামী বুধবার বামে আদরকছড়া বাজারে হাটবাজার বসবে। সেখান থেকে তিনি তার মা, তার বোন ও বোন জামাই এবং তার বোন ঝি, ভাইয়ের জন্য কাপড় চোপড় কিনে এনে দেবেন। এরই মাঝে তাদের কাটাতে হবে এক কাপড়ে। কী আর করা! ভাগ্যে যা আছে তা-ই হবে! ভগবান বুদ্ধ, বনবান্তে সহায়। তিনি যদি সহায় না হন তবে তাদের অনেককেই কেন তিনটিলা বনবিহারে আশ্রয় নিতে হলো!
তাদের কষ্টের কথা কি সরেজমিনে তোমরা দেখতে যেতে চাও? তবে যাও লুঙুদু উপজেলায়। সেখানে গেলে তোমরা দেখবে। বিস্তীর্ণ এলাকা পুড়ে গেছে। সব শুনশান। পোড়াবাড়ি ও ভিটা তোমরা দেখবে। তারপর দেখবে হাঁস মুরগি গরু ছাগল চড়ছে মাঠে উঠানে। দেখার কেউই নেই!

সর্বাধিক পঠিত

লুঙুদু পালাহ- এক, দুই, তিন ও চার

[ফেসবুকে লংগদু পালাহ-১, ২, ৩, ৪ আকারে এই লেখাগুলো লিখেছিলাম। আরো কিছু বিষয়ে লেখার কথা থাকলেও আরো নতুন সমস্যা এসে যোগ হবার কারণে এবং কিছু ক...